শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২০

স্বর্ণকুমারী দেবী

 স্বর্ণকুমারী দেবী 


এই দিনে
2 বছর আগে
28 আগস্ট, 2018 
সবার সাথে শেয়ার করা হয়েছে
সবাই
শ্রদ্ধাঞ্জলি ::
*******************************************
স্বর্ণকুমারী দেবী  (২৮ আগস্ট, ১৮৫৫ – ৩ জুলাই, ১৯৩২) ।
ছিলেন বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, সংগীতকার ও সমাজ সংস্কারক। 
তিনিই ছিলেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম উল্লেখযোগ্য মহিলা সাহিত্যিক।
 
স্বর্ণকুমারী দেবী ছিলেন দ্বারকানাথ ঠাকুরের পৌত্রী এবং দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের চতুর্থ কন্যা। 
তাঁর তিন দিদির নাম ছিল সৌদামিনী, সুকুমারী ও শরৎকুমারী। 
তাঁর ছোটোবোনের নাম ছিল বর্ণকুমারী। সৌদামিনী ছিলেন বেথুন স্কুলের প্রথম যুগের ছাত্রী। ঠাকুর পরিবারের অন্যান্য মহিলা সদস্যেরা তাঁকে অনুসরণ করলেও, স্বর্ণকুমারী দেবী প্রধানত বাড়িতেই লেখাপড়া শিখেছিলেন। তিনি তাঁর অনুজ ভ্রাতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চেয়ে পাঁচ বছরের বড়ো ছিলেন।
জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে শিক্ষার পরিবেশ ছিল। দেবেন্দ্রনাথের তৃতীয় পুত্র হেমেন্দ্রনাথ শিক্ষার প্রসারের বিষয়ে বিশেষ উৎসাহী ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, বিদ্যালয়ের তুলনায় বাড়িতেই তাঁরা অধিক শিক্ষালাভ করেছিলেন। স্বর্ণকুমারী দেবীর স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়, তাঁদের শিক্ষয়িত্রী শ্লেটে কিছু লিখে দিতেন, সেই লেখাটিই তাঁরা টুকে লিখতেন। দেবেন্দ্রনাথ এ কথা জানতে পেরেই এই যান্ত্রিক শিক্ষাদান পদ্ধতিটি তুলে দেন। পরিবর্তে তিনি অযোধ্যানাথ পাকড়াশি নামে এক দক্ষ শিক্ষককে নিয়োগ করে মেয়েদের লেখাপড়া শেখার ব্যবস্থা করেন।
১৮৬৮ সালে জানকীনাথ ঘোষালের সঙ্গে স্বর্ণকুমারী দেবীর বিবাহ হয়। জানকীনাথ ছিলেন নদিয়া জেলার এক জমিদার পরিবারের শিক্ষিত সন্তান। ঠাকুর পরিবার ছিল পিরালী থাকভুক্ত ব্রাহ্মণ। পিরালী ব্রাহ্মণ বংশের কন্যাকে বিবাহ করার জন্য জানকীনাথ পরিবারচ্যূত হয়েছিলেন। কিন্তু দৃঢ়চেতা জানকীনাথ ব্যবসা করে সাফল্য অর্জন করেন এবং নিজস্ব এক জমিদারি গড়ে তুলে "রাজা" উপাধি অর্জন করেন। তিনি ছিলেন একজন দিব্যজ্ঞানবাদী (থিওজফিস্ট) এবং ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তথা আদি যুগের সক্রিয় সদস্য।
 
জানকীনাথ ও স্বর্ণকুমারী দেবীর তিন সন্তান ছিলেন। এঁরা হলেন হিরন্ময়ী দেবী (১৮৭০ – ১৯২৫), জ্যোৎস্নানাথ ঘোষাল (১৮৭১ – ১৯৬২) ও সরলা দেবী চৌধুরাণী (১৮৭২ – ১৯৪৫)। জ্যোৎস্নানাথ ঘোষাল আইসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পশ্চিম ভারতে কর্মে বহাল হয়েছিলেন।
সংগীত, নাটক ও সাহিত্যে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির পুরুষ সদস্যদের সৃষ্টিশীলতা স্বর্ণকুমারী দেবীকেও স্পর্শ করেছিল। এই সময় জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর এই তিন ক্ষেত্রে নানা পরীক্ষানিরীক্ষা চালাচ্ছিলেন। তাঁকে সাহায্য করছিলেন অক্ষয়চন্দ্র চৌধুরী ও রবীন্দ্রনাথ। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের জীবন-স্মৃতি থেকে জানা যায়, জানকীনাথ ইংল্যান্ডে গেলে স্বর্ণকুমারী দেবী জোড়াসাঁকোয় এসে থাকতে শুরু করেছিলেন। এই সময় তিনিও তাঁদের সঙ্গে নতুন পরীক্ষানিরীক্ষায় মেতে ওঠেন। জ্ঞানদানন্দিনী দেবী যখন পরিবারের প্রাচীন প্রথাগুলিকে নারী স্বাধীনতার পথ প্রশস্ত করছিলেন, ঠিক সেই সময় স্বর্ণকুমারী দেবী সাহিত্য সাধনায় মগ্ন ছিলেন।
১৮৭৬ সালে স্বর্ণকুমারী দেবীর প্রথম উপন্যাস দীপনির্বাণ প্রকাশিত হয়। ইতিপূর্বে ১৮৫২ সালে হানা ক্যাথরিন মুলেনস তাঁর ফুলমণি ও করুণার বৃত্তান্ত প্রকাশ করে বাংলা ভাষার প্রথম ঔপন্যাসিকের মর্যাদা লাভ করেছিলেন।; কিন্তু স্বর্ণকুমারী দেবীই ছিলেন প্রথম বাঙালি মহিলা ঔপন্যাসিক।
দীপনির্বাণ ছিল জাতীয়তাবাদী ভাবে অনুপ্রাণিত এক উপন্যাস। এরপর স্বর্ণকুমারী দেবী একাধিক উপন্যাস, নাটক, কবিতা ও বিজ্ঞান-বিষয়ক প্রবন্ধ রচনা করেন। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান-পরিভাষা রচনার বিষয়ে তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল। তিনি অসংখ্য গানও রচনা করেছিলেন। সেই যুগের পরিপ্রেক্ষিতে স্বর্ণকুমারী দেবী বা কামিনী রায়ের মতো মহিলা সাহিত্যিকদের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। তাঁরা ছিলেন শিক্ষিত বাঙালি নারীসমাজের প্রথম যুগের প্রতিনিধি। সেই হিসাবে তাঁদের দায়িত্বগুলি সাহিত্যরচনার মাধ্যমে পালন করে গিয়েছিলেন তাঁরা।
১৮৭৯ সালে স্বর্ণকুমারী দেবী প্রথম বাংলা গীতিনাট্য (অপেরা) বসন্ত উৎসব রচনা করেন। পরবর্তীকালে তাঁর অনুজ রবীন্দ্রনাথ এই ধারাটিকে গ্রহণ করে সার্থকতর গীতিনাট্য রচনায় সফল হয়েছিলেন।
১৮৭৭ সালে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ পারিবারিক পত্রিকা ভারতী চালু করেন। এই পত্রিকার প্রথম সম্পাদক ছিলেন দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর। দ্বিজেন্দ্রনাথ সাত বছর এই পত্রিকা সম্পাদনা করেছিলেন। এরপর এগারো বছর এই পত্রিকা সম্পাদনা করেন স্বর্ণকুমারী দেবী। তিনি এই পত্রিকার স্বাতন্ত্র্য সৃষ্টি করতে কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন। এই পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশিত হত। এর ভাষাও ছিল সহজ সরল। সমালোচকেরা এই পত্রিকার উচ্চ প্রশংসা করতেন। স্বর্ণকুমারী দেবীর কন্যারা বারো বছর ও রবীন্দ্রনাথ এক বছর এই পত্রিকা সম্পাদনা করেছিলেন। এরপর আট বছর স্বর্ণকুমারী দেবী আবার এই পত্রিকা সম্পাদনা করেন। তারপর নয় বছরের ব্যবধানে আবার স্বর্ণকুমারী দেবী এই পত্রিকার সম্পাদনার ভার গ্রহণ করেন। এরপর দুই বছর সম্পাদনার পর তিনি পত্রিকাটি বন্ধ করে দেন। এই ভাবে ভারতী পত্রিকা প্রায় অর্ধশতাব্দীকালব্যাপী প্রকাশিত হয়।
ভারতী যখন প্রথম প্রকাশিত হয় তখন রবীন্দ্রনাথের বয়স ছিল মাত্র ষোলো। প্রথম সংখ্যা থেকেই এই পত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হতে থাকে। আসলে এই পত্রিকার চাহিদাই রবীন্দ্রনাথকে নিয়মিত লিখতে বাধ্য করত এবং বহু বছর তিনি এক নাগাড়ে এই পত্রিকায় নিজের লেখা পাঠিয়ে এসেছিলেন।
স্বর্ণকুমারী দেবীর স্বামী ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সেক্রেটারি ছিলেন। তিনি নিজেও সামাজিক সংস্কার ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ১৮৮৯ ও ১৮৯০ সালে পণ্ডিতা রামাবাই, রামাবাই রানাডে ও কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে তিনিও জাতীয় কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশনে অংশ নেন। তিনিই ছিলেন প্রথম মহিলা যিনি জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে প্রকাশ্যে অংশগ্রহণ করেছিলেন।
অনাথ ও বিধবাদের সাহায্যার্থে ১৮৯৬ সালে ঠাকুরবাড়ির অন্যান্য সদস্যদের নিয়ে স্বর্ণকুমারী দেবী "সখীসমিতি" স্থাপন করেন। ১৮৯৮ সালে ভারতী ও বালক পত্রিকায় নিম্নলিখিত প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়:
সখীসমিতির প্রধান উদ্দেশ্য হল অসহায় অনাথ ও বিধবাদের সহায়তা করা। এই কাজ দু'ভাবে করা হবে। যেক্ষেত্রে এই সব বিধবা ও অনাথদের কোনো নিকটাত্মীয় নেই বা থাকলেও তাঁদের ভরণপোষণের ক্ষমতা সেই আত্মীয়দের নেই, তাঁদের ভরণপোষণের সম্পূর্ণ দায়িত্ব সখীসমিতি নেবে। অন্যান্য ক্ষেত্রে সখীসমিতি তাঁদের যথাসাধ্য সাহায্য করবে। সখীসমিতি যে সব মেয়েদের পূর্ণ দায়িত্ব নেবে, তাঁদের লেখাপড়া শিখিয়ে স্ত্রীশিক্ষার প্রসার ঘটাবে। তাঁরা শিক্ষা সম্পূর্ণ করে অন্যান্য মহিলাদের লেখাপড়া শেখাবেন। সমিতি এই জন্য তাঁদের পারিশ্রমিকও দেবে। এইভাবে দু'টি উদ্দেশ্য সাধিত হবে। হিন্দু বিধবারা হিন্দুধর্মের অনুমোদনক্রমেই শ্রমদানের মাধ্যমে উপার্জনক্ষম হয়ে উঠবেন।
সংগঠন পরিচালনা কেবলমাত্র সদস্যদের চাঁদায় সম্ভব নয় অনুভব করে, স্বর্ণকুমারী দেবী বেথুন কলেজে একটি বার্ষিক মেলার আয়োজন করেন। এই মেলায় ঢাকা ও শান্তিপুরের শাড়ি, কৃষ্ণনগর ও বীরভূমের হস্তশিল্প এবং বহির্বঙ্গের কাশ্মীর, মোরাদাবাদ, বারাণসী, আগ্রা, জয়পুর ও বোম্বাইয়ের হস্তশিল্প প্রদর্শিত হয়। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ভারতের দেশজ পণ্যের প্রদর্শনী ও বিক্রয়ের ব্যবস্থা করা। সেই যুগে এই মেলা কলকাতার সমাজে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
১৯০৬ সাল পর্যন্ত সখীসমিতি সক্রিয় ছিল। তারপর হিরন্ময়ী বিধবা আশ্রয় এর দায়িত্বভার গ্রহণ করে। স্বর্ণকুমারী দেবীর কন্যা হিরন্ময়ী দেবীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে শশিপদ বন্দ্যোপাধ্যায় বরানগরে একটি বিধবা আশ্রম চালু করেন। এই। আশ্রমের নাম ছিল "মহিলা বিধবা আশ্রম"। হিরন্ময়ী দেবীর মৃত্যুর পর এই আশ্রমটিরই নতুন নামকরণ হয় "হিরন্ময়ী বিধবা আশ্রম"। মহিলা বিধবা আশ্রমের প্রতিষ্ঠাকালীন কার্যনির্বাহী সমিতিতে ছিলেন স্বর্ণকুমারী, ময়ূরভঞ্জের মহারানি সুচারু দেবী, কোচবিহারের মহারানি সুনীতি দেবী (উভয়েই ছিলেন কেশবচন্দ্র সেনের কন্যা), লেডি হ্যামিলটন, প্রিয়ংবদা দেবী, শ্রীমতী চ্যাপম্যান ও শ্রীমতী সিংহ। হিরন্ময়ী দেবী ছিলেন আশ্রমের সচিব। হিরন্ময়ী দেবীর কন্যা তথা আশ্রমের পরিচালিকা কল্যাণী মল্লিকের লেখা থেকে জানা যায়, ১৯৪৯ সালেও এই আশ্রম সফলভাবে চালু ছিল।
"সখীসমিতি" নামটি রবীন্দ্রনাথের দেওয়া। সরলা রায়ের অনুরোধে সখীসমিতির অর্থসংগ্রহের উদ্দেশ্যে রবীন্দ্রনাথ "মায়ার খেলা" নৃত্যনাট্যটি লিখে মঞ্চস্থ করেছিলেন।
রচনাবলী :
উপন্যাস: দীপনির্বাণ (১৮৭৬), মিবার-রাজ (১৮৭৭), ছিন্নমুকুল (১৮৭৯), মালতী (১৮৭৯), হুগলীর ইমামবাড়ী (১৮৮৭), বিদ্রোহ (১৮৯০), স্নেহলতা (১৮৯২), কাহাকে (১৮৯৮), ফুলের মালা (১৮৯৫), বিচিত্রা (১৯২০), স্বপ্নবাণী (১৯২১), মিলনরাতি (১৯২৫)। সাব্বিরের দিন রাত [১৯১২]
নাটক: বিবাহ-উৎসব (১৮৯২), বসন্ত-উৎসব, রাজকন্যা, দিব্যকমল দেবকৌতুক, কনেবদল, যুগান্ত, নিবেদিতা ।
কাব্যগ্রন্থ: গাথা, গীতিগুচ্ছ।
বিজ্ঞান-বিষয়ক প্রবন্ধ: পৃথিবী।
১৯২৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় স্বর্ণকুমারী দেবীকে "জগত্তারিণী স্বর্ণপদক" দিয়ে সম্মানিত করে। ১৯২৯ সালে তিনি বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলনের সভাপতিত্ব করেন।
(সৌজন্যে:উইকিপিডিয়া)
 
শেয়ার করেছেন : - প্রণব কুমার কুণ্ডু

 










 
প্রণব কুমার কুণ্ডু

 

সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২০

মাউন্ট এভারেস্ট ও উপেক্ষিত রাধানাথ শিকদার

 

মাউন্ট এভারেস্ট ও উপেক্ষিত রাধানাথ শিকদার

১৮৫২ সালের কোনো একদিনের কথা। দুপুরবেলা লাঞ্চের পর ‘দ্য গ্রেট ট্রিগোনোমেট্রিক সার্ভে’র বড়সাহেব দিনের বাদবাকি সময়ের কাজগুলো সেরে ফেলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ঠিক তখন হাতে একটি ফাইল নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকলেন এক তরুণ। এই তরুণ এসে দাবি করলো সে নাকি বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু পর্বতশৃঙ্গ আবিষ্কার করে ফেলেছে। বড় সাহেব বড়সড় চমকই খেলেন। পরে অবশ্য সারা বিশ্বই চমকে গিয়েছিল এই তরুণের আবিষ্কারে। তার নাম রাধানাথ শিকদার। আমরা অনেকেই ভুলে গিয়েছি তাকে। মেধাবী এই ব্যক্তিটি জীবদ্দশাতেও ছিলেন বড্ড উপেক্ষিত।

রাধানাথ শিকদার; ছবিসূত্র: উইকিমিডিয়া কমন্স

১৮১৩ সালের অক্টোবরে জোড়াসাঁকোর শিকদার পাড়ায় এক গোঁড়া ব্রাহ্মণ পরিবারে রাধানাথ জন্মেছিলেন, বাবা তিতুরাম শিকদার। শিকদারেরা মুসলিম সাম্রাজ্যের প্রাক্কাল থেকে প্রধানত শান্তিরক্ষক হিসেবে কাজ করতো। বংশ পরম্পরায় এ কাজ করার কারণে তাদের মধ্যে লেখাপড়ার চর্চা অনেক কমে এসেছিল। কিন্তু তারপরেও বাবার তত্ত্বাবধানে রাধানাথের প্রাথমিক শিক্ষায় ঘাটতি হয়নি। রাধানাথ প্রথমে গ্রামের পাঠশালায় এবং পরে কমল বসুর স্কুলে ভর্তি হন। ১৮২৪ সালে হিন্দু কলেজ (বর্তমান প্রেসিডেন্সি কলেজ)-এ ভর্তি হন। সে সময় তিনি যে টাকা বৃত্তি হিসেবে পেতেন তার বড় একটা অংশ দিয়ে বই কিনে ফেলতেন। পারিবারিক অবস্থা ভালো না থাকায় অনেক সময় পড়ালেখাতে মন দিতে পারতেন না। তিনি লিখেছিলেন,

“কলেজে একমনে পড়িতে পাইতাম না, একবার পড়ার কথা মনে পড়িত, পরক্ষণেই বাটিতে ফিরিয়া যাইয়া কি খাইব, মা বুঝি এখনও কিছু খান নাই, এই সকল ভাবনা মনে উত্থিত হইয়া পড়ার ব্যাঘাত ঘটিত।”

কলেজে পড়াকালীন সময় থেকেই তিনি গণিত চর্চায় অসাধারণ মেধার স্বাক্ষর রাখেন। সে সময়ের ভারতবর্ষের স্বল্প সংখ্যক ব্যক্তির মধ্যে তিনি ছিলেন একজন যিনি স্যার আইজ্যাক নিউটনের ‘প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা’ পড়েছিলেন এবং চর্চা করেছিলেন। ছাত্রাবস্থায় রাধানাথ গ্যালিলিও, টাইকো ব্রাহে, জোহানেস কেপলার, শ্রীধর আচার্য এবং ভাস্করাচার্যের বৈজ্ঞানিক লেখা পড়েন। হেলেনিক গণিতবিদ থেলিস, আর্কিমিডিস এবং ইরাটোথেনিসের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তিনি বক্রতলীয় ত্রিকোণমিতি অধ্যয়ন করেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানের পর্যবেক্ষণের প্রতিও তার বিশেষ আগ্রহ ছিল। তিনি তার অসাধারণ মেধার সাক্ষ্য স্বরূপ বেশ কয়েকটি ক্লাসে ডাবল প্রমোশন লাভ করেন। কলেজে পড়াকালীন সময়েই তার রচিত দুটি বৃত্তের উপর স্পর্শক রেখা (Tangent) অঙ্কন করার পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করেন এবং তার প্রবন্ধ Gleanings in Science (Vol. III, 1831) সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়।

দুর্দান্ত ইংরেজি পারতেন। একবার কলকাতার টাউন হলে শেক্সপিয়রের ‘অ্যাজ ইউ লাইক ইট’ থেকে পাঠ করে সকলকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। গ্রিক এবং লাতিন ভাষাতেও দক্ষতা ছিল। সর্বস্তরে বিজ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে তিনি ইংরেজি ভাষায় রচিত বিভিন্ন বিজ্ঞানগ্রন্থ সংস্কৃত ভাষায় অনুবাদ করার উদ্যোগ নেন। তখনো বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চা শুরু হয়নি। এর কিছুকাল পর তার বন্ধু প্যারীচাঁদ মিত্র বাংলা ভাষায় প্রথম উপন্যাস রচনা করেন।

সব ছাত্রছাত্রীই একপর্যায়ে তাদের মানসিক উৎকর্ষ সাধন এবং মেধা বিকাশের ক্ষেত্রে তাদের শিক্ষক কিংবা পথপ্রদর্শক দ্বারা প্রভাবিত হয়। রাধানাথও অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন তার শিক্ষক ডিরোজিও দ্বারা। ডিরোজিও ছিলেন তৎকালীন ভারতবর্ষের (বিশেষত পশ্চিমবঙ্গ) অসাম্প্রদায়িকতা ও উন্মুক্ত বুদ্ধিবৃত্তিচর্চার অগ্রদূত। জন্মসূত্রে বাঙালি না হলেও বাঙালিদের সঙ্গে মনে প্রাণে জড়িয়ে ছিলেন তিনি। একাধারে শিক্ষক, কবি, সাংবাদিক এই মানুষটি তার বৈদ্যগ্ধতা আর বৌদ্ধিক উৎকর্ষে উদ্যমী হয়ে সমাজ সংস্কারের কাজে নেমেছিলেন। যখন তিনি শিক্ষকতা শুরু করলেন, তার সান্নিধ্যে থাকা প্রাণোচ্ছল তরুণেরা তার প্রভাবে প্রভাবিত হতে শুরু করলো। তার অন্যতম ফসল ছিল আমাদের রাধানাথ শিকদার।

ডিরোজিওর ভাস্কর্য; ছবিসূত্র: vle.du.ac.in

আরেকজন মানুষ দ্বারা রাধানাথ প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন শিক্ষক মিস্টার টাইটলার। তার সম্বন্ধে বলতে গিয়ে রাধানাথ বলেছেন,

“কলেজের সকল শিক্ষক অপেক্ষা টাইটলার সাহেবের শিক্ষাপ্রণালী অতি উত্তম। তিনি প্রশ্নচ্ছলে শিক্ষা দিতেন। … শেষ তিন বৎসর আমি রস ও টাইটলার সাহেবের বক্তৃতা শ্রবণ করি। ১৮৩০ খৃঃ অব্দে টাইটলার সাহেবের নিকট গণিত শাস্ত্র শিক্ষা করি। এই বৎসর হইতে উচ্চ গণিতের শিক্ষা আরম্ভ হয়। এই বৎসর ইঁহার নিকট নিউটনের প্রিন্সিপিয়া (Newton’s Principia) গ্রন্থের প্রথম ভাগ অধ্যয়ন করি। পর বৎসর সাহেবের বক্তৃতা শ্রবণ ও বাটিতে নিজে চেষ্টা করিয়া উচ্চ গণিতের কতক কতক বিষয়ে জ্ঞান লাভ করি।”

দারিদ্র্যের কষাঘাতে যখন রাধানাথ কলেজ ছাড়লেন তখন তার একটি চাকরির বড্ড দরকার ছিল। তখন যোগ দিলেন ‘দ্য গ্রেট ট্রিগোনোমেট্রিক সার্ভে’র কলকাতা অফিসে গণণাকারী হিসেবে। প্রতি মাসে মাইনে পেতেন মাত্র তিরিশ টাকা। এ পদে নিযুক্ত হওয়া প্রথম ভারতীয় ছিলেন রাধানাথ শিকদার। সে সময় দ্য গ্রেট ট্রিগোনোমেট্রিক সার্ভেতে একটি পদের জন্য সুপারিশ করেন সার্ভেয়র জেনারেল জর্জ এভারেস্টকে। জেনারেল এভারেস্টের তখন গোলকীয় ত্রিকোণমিতি এবং বক্র জ্যামিতিতে দক্ষ একজন গণিতবিদ প্রয়োজন। কারণ এভারেস্টের মূল কাজ ছিল দক্ষিণ ভারত থেকে নেপাল পর্যন্ত যে দ্রাঘিমাংশীয় চাপ রয়েছে তার সঠিক পরিমাপ বের করা। ফলে ঐ অংশের জিওয়েড (Geoid)-এর আকার অনুমান করা যায়।

টাইটলার সাহেবের সুপারিশে তাই রাধানাথকে জর্জ এভারেস্ট লুফে নিলেন। ১৮৩২ সালের ১৫ অক্টোবর রাধানাথ কাজে নিযুক্ত হয়ে চলে গেলেন ভূপালের সেরোঞ্জ বেইজ লাইনে (Serunge Base Line)। সেখানে গিয়ে তিনি জিওডেটিক প্রসেস এর উপর বিশদ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। পাশাপাশি নিজের আগ্রহেই গণিতের বিভিন্ন বই অধ্যয়ন ও গণিত চর্চা করতে থাকেন।

গ্রেট ট্রিগনোমেট্রিক্যাল সার্ভের সময় ‘ক্যালকাটা বেসলাইন’ পরিমাপের কাজ চলছে; শিল্পী জেমস প্রিন্সেপ, ১৮৩২

ব্যারোমিটারের সাথে যুক্ত থাকা ধাতব স্কেলের তাপজনিত প্রসারণ এবং ব্যবহৃত পারদের প্রসারণজনিত পরিমাপের ত্রুটি সার্ভের পরিমাপে বিচ্যুতি ঘটায়। এই বিচ্যুতি বাতিলের জন্য যে সূত্র ইউরোপে ব্যবহৃত হতো তা রাধানাথ জানতেন না। তাই তিনি নিজের বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসা ও অন্তর্দৃষ্টি ব্যবহার করে শূন্য ডিগ্রিতে ব্যারোমিটারের পাঠ নির্ণয়ের সূত্র উদ্ভাবন করেন। এই সূত্র সম্বলিত বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধটি পরে এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বেঙ্গল জার্নালে প্রকাশিত হয়। শুধু তা-ই নয়, সার্ভে চলাকালীন সময়ে রাধানাথের হাত ধরে প্রচলিত অনেক নিয়ম কানুনই কয়েক দশক ধরে জরিপের কাজে প্রচলিত হতে থাকে। এই ব্যাপারগুলোতে রাধানাথের পদার্থবিজ্ঞানেও অসাধারণ দক্ষতার ব্যাপারটি ফুটে ওঠে।

জর্জ এভারেস্ট; ছবিসূত্র: Alchetron

গণিত আর পদার্থবিজ্ঞানে এরকম দক্ষ ব্যক্তিকে এভারেস্ট নিংড়ে নিতে চেয়েছিলেন। তাই ১৮৩৭-এ যখন রাধানাথ ডেপুটি কালেক্টর পদে যেতে চাইলেন তখন এভারেস্ট রাধানাথকে সুপারিশপত্র তো দিলেনই না বরং তাকে আটকে রাখলেন। আর ব্যবস্থা করলেন তিনি যেন ইংরেজ সরকারের অন্য কোনো দফতরে কাজ না পান। কারণ রাধানাথ শুধুমাত্র যে মেধাবী ও দক্ষতাসম্পন্ন গণিতবিদ ছিলেন তা-ই নয়, তিনি ছিলেন সুঠাম দেহ ও দৃঢ় শারীরিক গঠনের অধিকারী। তার উপর ছিলেন বেশ বলবান ও সাহসী। কথা ও কাজে মিল ছিল। মুখে যা বলতেন তা করে দেখাতেন। কাউকে ভয় পেতেন না যেমন, তেমনি কারও মুখাপেক্ষীও ছিলেন না। সার্ভের কাজে যে প্রচুর শ্রম দরকার হতো, রাধানাথের পক্ষে তা করতে তেমন সমস্যা হতো না। রাধানাথের সাহায্য নিয়ে এভারেস্ট হায়দ্রাবাদের বিদর থেকে মুসৌরির ব্যানোগ পর্যন্ত প্রায় ৮৭০ মাইল দূরত্বের গ্রেট আর্কটি জরিপ করে ফেলেন।

এই কাজটি সম্বন্ধে হেনরী লরেন্সের বলেছিলেন– “A measurement exceeding all others as much in accuracy as in length.” অন্যদিকে সি. আর. মার্কহ্যামের মতে– “One of the most stupendous works in the whole history of science.”

সার্ভেয়র জেনারেল এভারেস্টের মুখ থেকে কারো প্রশংসা খুব কমই শোনা যেত। কিন্তু রাধানাথ ছিলেন এর ব্যতিক্রম। ১৮৩৮ সালে তিনি রাধানাথ সম্বন্ধে বলেছিলেন, ভারতে এ দেশের বা ইউরোপের এমন কেউ নেই যিনি রাধানাথের সঙ্গে তুলনীয়। এভারেস্ট মনে করতেন, গণিতে তার সমকক্ষ বিশ্বেই খুব কম আছে। রাধানাথের উপর এভারেস্ট এতটাই নির্ভর করতেন যে বাবার সঙ্গে দেখা করার জন্য রাধানাথকে ছুটি দিতেও তিনি চাইতেন না, বরং এভারেস্ট চাইতেন তার বাবাই এসে যেন রাধানাথের সঙ্গে দেখা করেন। এ প্রসঙ্গে ১৮৪১ সালের ৩রা জুলাই দেরাদুন থেকে রাধানাথের বাবা তিতুরামকে লেখা এভারেস্টের একটি চিঠি ছিল–

“I wish I could have persuaded you to come to Dehra Dun for not only it would have given me the greatest pleasure to show you personally how much I honour you for having such a son as Radhanath, but you yourself have, I am sure, been infinitely gratified at witnessing the high esteem in which he is held by his superiors and equals.”

১৮৪৩ সালে এভারেস্ট চাকরি থেকে অবসর নিলেন। তার স্থলে তখন নিযুক্ত হলেন কর্ণেল এন্ড্রু ওয়া (Col. Andrew Scott Waugh)। তিনিও রাধানাথের কার্যক্রমে বেজায় খুশি। আর এভারেস্টের মতোই রাধানাথকে অন্য কোথাও কাজ করতে দিতে নারাজ। ১৮৫০ সালে রাধানাথ যখন কলকাতায় বদলির দরখাস্ত করলেন, তখন তিনি তাতেও বাগড়া দিলেন। রাধানাথকে তার দফতরে রেখে দেয়ার জন্যে তিনি রাধানাথের মাইনে আরো বাড়িয়ে দিলেন। রাধানাথের কাজ সম্বন্ধে তৎকালীন আর্যদর্শন পত্রিকা লিখেছিল-

“যখন রাধানাথ এই বিভাগে প্রবিষ্ট হন তখন জরিপ করিবার অনেক প্রথা অনাবিষ্কৃত ছিল। দেশের অবস্থাও অতি অল্পই জানা ছিল। যে যে কারণে গণনা ভুল হইত সে সকলও অজ্ঞাত ছিল। সে আমলে জরিপ করিতে যে কত কষ্ট সহ্য করিতে হইত তাহা কর্ণেল এভারেষ্টের সুবৃহৎ গ্রন্থে বিশেষ করিয়া লেখা আছে। বরফ, হিম, জল, কাদা, বৃষ্টি ভোগ করিয়াও রাত্রি জাগরণ করিয়া প্রফুল্ল চিত্তে কয়জন লোক কাজ করিতে পারে!”

প্রায় বিশ বছর পর রাধানাথ যখন কলকাতায় বদলি হয়ে এলেন তখন তিনি প্রধান কম্পিউটর আর পাশাপাশি খনিতত্ত্ব বিভাগের সুপারিন্টেন্ডেন্ট হিসেবে কাজ করা শুরু করলেন। এর কিছুকাল পরে কর্ণেল ওয়ার নির্দেশে রাধানাথ হিমালয়ের বরফে ঢাকা কিছু পর্বতশৃংগের উচ্চতা মাপার কাজ শুরু করলেন। তখনকার সময় নাম না দেয়া হিমালয়ের পর্বতশৃঙ্গগুলো সূচিত হলো রোমান সংখ্যা দিয়ে। এরকম একটা শৃঙ্গ ছিল পিক ফিফটিন (Peak XV)। রাধানাথের নেয়া প্রায় ছয়টি রিডিং প্রমাণ করলো, পিক ফিফটিনের উচ্চতা ২৯,০১৭ ফুট, যা পুরনো মাপ অনুযায়ী উচ্চতম পর্বতশৃংগ কাঞ্চনজঙ্ঘার চেয়েও বেশি উঁচু।

এই পিক ফিফটিনের রিডিং নেয়ার জন্য রাধানাথের সবচেয়ে বড় অবদান ছিল বায়ুমণ্ডলে আলোর প্রতিসরণের জন্য বিচ্যুতি এড়াতে প্রয়োজনীয় সংশোধন নির্ণয় করা। এ সংশোধন নির্ণয় করে রাধানাথ পিক ফিফটিনের উচ্চতা নির্ণয় করে মূল কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন। এরপরই সেই দৃশ্যের অবতারণা হয়েছিল যে দৃশ্যের অবতারণা লেখার একদম শুরুতে করা হয়েছে। এরপর বড় সাহেব কর্ণেল ওয়া নিজে তথ্যটি যাচাই করে জনসমক্ষে স্বীকৃতি দিলেন, এই পিক ফিফটিনই হল বিশ্বের সবচেয়ে বড় পর্বতশৃঙ্গ। কিন্তু এর নাম কী হবে ? এভারেস্ট যখন দায়িত্বে ছিলেন তখন তিনি স্থানীয় এলাকার মানুষের মুখের নাম অনুযায়ী পর্বতশৃংখে  নাম প্রস্তাব করতেন। এভাবেই কাঞ্চনজঙ্ঘা, নন্দাদেবী ইত্যাদি নাম প্রচলিত হয়েছে। কিন্তু এই পিক ফিফটিনের নাম নিয়ে ঝামেলা হলো। কারণ পিক ফিফটিন নেপাল আর তিব্বতের মাঝে অবস্থিত, দুই দেশে এর নাম দুই রকম। তখন কর্ণেল ওয়া নিজের পুরনো প্রভুকে একজন বাধ্য ভৃত্যের মতো খুশি করতে চাইলেন। তিনি রয়াল জিওগ্রাফিক সোসাইটিকে একটি চিঠি লিখে পিক ফিফটিনকে ‘মাউন্ট এভারেস্ট’ নামের প্রস্তাব জানালেন। যে শৃঙ্গ আবিষ্কার বা পরিমাপে এভারেস্টের কোনো ভূমিকাই ছিল না তার নাম হয়ে গেল মাউন্ট এভারেস্ট। রাধানাথ রয়ে গেলেন উপেক্ষিত।

কর্ণেল ওয়ার আঁকা এভারেস্টের ভৌগোলিক স্কেচ; ছবিসূত্র: natureinfocus.in

মানুষটিকে কোনো কালেই সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজ সরকার স্বীকৃতি দিতে চায়নি। বারংবার সার্ভে থেকে সরে যেতে চাইলেও তাঁকে কর্মচারী হিসেবেই রাখা হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে তাকে প্রশংসা করা হয়েছে। মাইনে বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু তার প্রাপ্য স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত করাই এর মূল কারণ।

একটি বড় উদাহরণ আমরা দেখতে পাই ১৯০৪ সালে নেচার সাময়িকীতে সিডনি জেরাল্ড বারার্ডের নিবন্ধ ‘মাউন্ট এভারেস্ট: দ্য স্টোরি অব আ লং কনট্রোভার্সি’তে। সেখানে এ প্রসঙ্গে মাত্র একটি বাক্য আছে। তিনি লিখেছেন- ১৮৫২ সাল নাগাদ কলকাতার দফতরে কর্মরত প্রধান গণক, দেরাদুনে অবস্থানরত সার্ভেয়র জেনারেল অ্যান্ড্রু ওয়াকে জানালেন, ‘আ পিক ডেজিগনেটেড ‘XV’ হ্যাড বিন ফাউন্ড টু বি হায়ার দ্যান এনি আদার হিদারটু মেজারড ইন দি ওয়ার্ল্ড’। এই প্রধান গণকটি নিশ্চিত রাধানাথ শিকদার। ওদিকে ভারতে সার্ভের ইতিহাসের আকরগ্রন্থ, রেজিনাল্ড হেনরি ফিলিমোর-এর হিস্টোরিক্যাল রেকর্ডস অব দ্য সার্ভে অব ইন্ডিয়ার পঞ্চম খণ্ডে (১৯৬৪) রাধানাথের নাম করে জানানো হচ্ছে, এভারেস্ট শৃঙ্গের উচ্চতা গণনায় তার হাত নেই, কাজ চলেছিল দেরাদুনে, কিন্তু তিনি ততদিনে কলকাতায় বদলি হয়ে এসেছেন। এই দুয়ের মধ্যে কোনটা সত্যি? আবার যে রেকর্ড নেয়া হয়েছিল সেটাও তো ওই ইংরেজ শাসকগোষ্ঠীর হাতেই করা। সেটাকেও বা কতটুকু নির্ভর্যোগ্য বলে ধরা যায়?

জরিপের জন্য অতি প্রয়োজনীয় বই ‘ম্যানুয়াল অব সার্ভেয়িং ফর ইন্ডিয়া’ প্রকাশিত হয় ১৮৫১ সালে। এর প্রথম ও দ্বিতীয় সংস্করণে ঠিকই রাধানাথের অবদানের কিয়দংশ ছিল। কিন্তু থ্যুলিয়ার কর্তৃক তৃতীয় সংস্করণ থেকে তার অবদানটুকু রেখে স্বীকৃতি লোপাট করে দেয়া হয়। নিজেদের কায়েমী গদি টিকিয়ে রাখতে এ ধরনের ন্যাক্কারজনক কাজ অবশ্য সব শাসক গোষ্ঠীই করে থাকে।

আর এদিকে আমরাই বা ক’জন মনে রেখেছি তাকে? শুধু রাধানাথের গণিতের জ্ঞান ও অন্যান্য অবদানের স্বীকৃতি দিয়ে জার্মানীর ব্যাভেরিয়ান শাখার বিখ্যাত ‘ফিলোসফিক্যাস সোসাইটি’ তাকে তাদের সদস্য নির্বাচিত করে। সে সময়ের ভারতীয়দের মধ্যে তিনিই প্রথম এ সম্মান লাভ করেছিলেন।

রাধানাথের স্মরণে ভারতীয় ডাকটিকিট; ছবিসূত্র: stampsathi.in

রাধানাথ ছিলেন অত্যন্ত সমাজ সচেতন মানুষ। ১৮৬২ সালে অবসর গ্রহণের পর তার বন্ধু প্যারিচাঁদ মিত্রের সাথে মিলে ‘মাসিক পত্রিকা’ নামে একটি পত্রিকা বের করেন। হিন্দু ধর্মে প্রচলিত বিভিন্ন কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তিনি বরাবরই সরব ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন দেশপ্রেমিক। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সর্বদা সোচ্চার ছিলেন। ১৮৪৩ সালে ম্যাজিস্ট্রেট ভ্যান্সিটার্টের সাথে বিবাদে জড়িয়ে পড়েন। এই ম্যাজিস্ট্রেট তার বিভাগে কর্মরত চাকরিজীবীদের দিয়ে ব্যক্তিগত কাজ করাতেন এবং তারা আপত্তি জানালে তাদেরকে চাবুক মারতেন। এই অমানবিক কাজের প্রতিবাদ করতে গিয়ে রাধানাথ ইংরেজদের সাথে বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়েন। ২০০ টাকা পরে জরিমানাও দিতে হয়েছিল তাকে।

রাধানাথ সর্বদা নিজের কাজেই ডুবে থাকতেন। অনেক ক্ষেত্রে মনে হয়, তার অসাধারণ গাণিতিক প্রতিভা যদি কেবলমাত্র সার্ভের জট না খুলতে ব্যবহৃত হয়ে অন্য গবেষণার কাজে নিযুক্ত হতো, হয়তো বিশ্ব আরো পরিণত ও প্রজ্ঞাবান একজন গণিতবিদ পেতো। বস্তুতই রাধানাথের সমকক্ষ মেধা সারা বিশ্বে অতুলনীয় ছিল। অকৃতদার এই মানুষটির কোনো ছেলেমেয়ে ছিল না। তিনি কোনোদিন বিয়ে করেননি। কিন্তু বাচ্চাদের তিনি বড্ড ভালোবাসতেন। পিতার মৃত্যুর পর তিনি গঙ্গার ধারে চন্দননগরে বাড়িতে এসে উঠেন। ১৮৭০ সালের ১৭ই মে আধুনিক ভারতের এই প্রথম বৈজ্ঞানিক-গণিতবিদ মৃত্যুবরণ করেন।

        1. তথ্যসূত্র
  1. রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ, শিবনাথ শাস্ত্রী
  2. দ্বি-শতবর্ষে রাধানাথ শিকদার– আশীষ লাহিড়ি
  3. আর্য্যদর্শন পত্রিকা, কার্ত্তিক সংখ্যা, ১২৯১ বঙ্গাব্দ
  4. সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান, সম্পাদনা – সুবোধ সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু, প্রথম খণ্ড, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, নভেম্বর ২০১৩, পৃষ্ঠা ৬৫১
  5. The Illustrated London News, 15 August 1857
  6. Radhanath Sikdar and colonial science- A. Lahiri
  7. Radhanath Sikdar: Beyond the Peak – Ashis Lahiri
  8. Radhanath Sikder : First Scientist in Modern India – Mukhopadhyay

ফিচার ইমেজ- Radhanath Sikdar and colonial science- A. Lahiri


Shared by Pranab Kumar Kundu                   

 

 

 

 

 

 

 

 

 

Pranab Kumar Kundu


রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২০

বনদেবী নারায়ণী

 

★★★বনদেবী নারায়ণী★★★

বাদাবনের কৃষিজীবী ও বনজীবী মানুষের মধ্যে এক উচ্চ আসন পেতে বসে আছেন এই দেবী। ইনিও বাঘের দেবতা বলে পরিচিত। তবে কিছুটা বাড়তি মাতৃত্বের অধিকারিণী। বিভিন্ন বাড়ির আশপাশের বনবাদড় অথবা ঝোপঝাড় সংলগ্ন স্থানে বনদেবী নারায়ণীর থান রয়েছে। বেশিরভাগ থান হল মাটির দেয়াল খড় অথবা টালির ছাউনি দেয়া ঘর। তালপাতার ছাউনি দেয়া ছোট্ট কুঁজিঘরের থান চোখে পড়েছে। সুন্দরবনের আরণ্যক সভ্যতার অন্যতম সাক্ষী হয়ে মা নারায়ণী মধ্যযুগ থেকে বিরাজ করছেন।

আলোকচিত্র টি খাড়ির কাষ্ট নির্মিত দরুবিগ্রহ...


Pijush Sarkar
এবং
আরও 7
জনের সাথে।

শেয়ার করেছেন :- প্রণব কুমার কুণ্ডু

 



















প্রণব কুমার কুণ্ডু

টিপু_সুলতানের কথা

 টিপু_সুলতানের কথা

টিপুকে হত্যা করার পর টিপুর অনেক চিঠি পত্র এবং জরুরী কাগজ পত্রও ইংরেজরা মহীশূর থেকে উদ্ধার করে ব্রিটেনে নিয়ে যায়। সেগুলো এখনও সংরক্ষণ করা আছে লণ্ডনের ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরীতে। সেই লাইব্রেরি থেকে ইতিহাসবিদ কে এম পানিকর, টিপুর লেখা কিছু চিঠিপত্র আবিষ্কার করে, যার প্রতিটি ছত্রে টিপুর হিন্দু বিদ্বেষ ফুটে ওঠে। 
 
👉১৭৮৮ সালের ২২ মার্চ টিপু তার সেনাপতি আব্দুল কাদেরকে চিঠিতে লিখে, "১২ হাজার এর বেশি হিন্দুকে মুসলমান করা হয়েছে। তার মধ্যে অনেক নাম্বুদ্রী ব্রাহ্মণ আছে। এই সাফল্যের খবর হিন্দুদের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচার করা দরকার। স্থানীয় হিন্দুদের মুসলমান করার জন্য তোমার কাছে ধরে নিয়ে এসো। একজন নাম্বুদ্রীও যেন বাদ না যায়।" বলাই বাহুল্য, এই হিন্দুরা নিশ্চয় টিপুকে ও ইসলামকে ভালোবেসে মুসলমান হয় নি। তাহলে তো আর হিন্দুদের ধরে আনার দরকার পড়তো না। 
 
👉১৭৮৮ সালের ১৪ ডিসেম্বর তার এক উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাকে টিপু লিখে, "আমি দুজন বিশ্বস্ত লোককে হুসেন আলীর সাথে পাঠাচ্ছি। এদের সাহায্যে সমস্ত হিন্দুদের ধরবে আর হত্যা করবে। যাদের বয়স ২০ বছরের কম তাদের জেলে ঢোকাবে এবং এই সংখ্যা ৫ হাজারের বেশি হলে বাকিদের গাছের সাথে ঝুলিয়ে দেবে। এটা আমার আদেশ।"
 
👉১৭৯০ সালের ১৯ জানুয়ারি, কর্মকর্তা বদ্রুস সামান খাঁকে টিপু লিখে, "তুমি কি জানো না যে, সম্প্রতি মালাবারে আমি বিশাল সাফল্য অর্জন করেছি এবং ৪ লক্ষেরও বেশি হিন্দুকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করেছি। আমি খুব শিঘ্রই অভিশপ্ত রমন নায়ারের বিরুদ্ধে অগ্রসর হচ্ছি। এই সব প্রজাদের ইসলামে ধর্মান্তরিত করাটা জরুরী। তাই আমি বর্তমানে শ্রীরঙ্গপত্তনমে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা আনন্দের সাথে স্থগিত রেখেছি।"হিন্দুদেরকে মুসলমান বানানোতে টিপুর এতই উৎসাহ যে, এই আনন্দের চোটে তার বাসস্থান শ্রীরঙ্গপত্তনমে ফিরতেও তার মন চাইছে না।
 
👉অন্য এক চিঠিতে, এই চিঠির তারিখ পাওয়া যায় নি, টিপু তার সেনাপতিদের আদেশ দিয়ে লিখেছে, "প্রত্যেক জেলার প্রত্যেক হিন্দুকে মুসলমান করতে হবে। গোপন জায়গা থেকে তাদের খুঁজে বের করতে হবে এবং সত্য, মিথ্যা, তরবারি ও ছলনার আশ্রয় নিয়ে তাদের সদলে ধর্মান্তরিত করে মুসলমান বানাতে হবে।"
 
👉টিপু, ১৭৯৭ সালের ৫ ফেব্র্রুয়ারি, আফগানিস্তানের শাসক, আহমেদ শাহ আবদালীর সেনাপতি জামান শাহকে এক চিঠিতে লিখে, "আল্লার ইচ্ছা ও রসূলের আদেশ অনুসারে আমাদের উচিত মিলিতভাবে ভারতের এই কাফেরদের বিরুদ্ধে জিহাদ শুরু করা।... প্রত্যেক শুক্রবার আমার রাজ্যের মুসলমানরা জুমার নামাজের পর খুতবা দিচ্ছে, 'হে আল্লা, আপনি ঐ ঘৃণ্য কাফেরদের মস্তক ছিন্ন করে দিন। তাদের পাপের বোঝা তাদের মাথায় পতিত হোক।' আমি বিশ্বাস করি সর্বশক্তিমান আল্লা আমাদের প্রার্থনাকে কার্যকর করবেন এবং এই পবিত্র কাজে হাত মিলিয়ে অগ্রসর হলে আমরা নিশ্চয় সফলকাম হবো।"
 
👉টিপুর নিজের হাতে লেখা দুটি আত্মজীবনী, "সুলতান-ই-তাওয়ারিখ" ও "তারিখ-ই-খুদাদাদি" রক্ষিত আছে। এই বইগুলোতে টিপু নিজেই উল্লেখ করেছে কিভাবে অত্যাচার নির্যাতন চালিয়ে হিন্দুদের সে মুসলমান বানিয়েছে। আর যারা মুসলমান হতে চাইতো না, টিপু তাদের কাউকে কাউকে ধরে এনে, অবসর সময়ের বিনোদন হিসেবে, তাদের চার হাত পায়ের সঙ্গে দড়ি বেঁধে, সেই দড়িগুলো চারটি হাতির পায়ের সাথে বেঁধে দিয়ে হাতিগুলোকে চারদিকে ছুটিয়ে দিয়ে তাদের দেহকে ছিন্ন ভিন্ন করে, তাদেরকে হত্যা করতো, এভাবে কোনো কোনো অবাধ্য হিন্দু কাফেরকে টিপু শাস্তি দিতো। এটি ছিলো নাকি টিপুর প্রিয় খেলা ও অবসর বিনোদনের একটি উপায়।
 
কর্নাটকে ক্ষমতায় এসে নৃশংস খুনি, উন্মাদ টিপু জয়ন্তী বাতিল করার বিজেপির সিধান্তকে সাধুবাদ।🙏🙏🙏
🙏 
 
ইতিহাস বইয়ে টিপু নিয়ে শুধু মিথ্যে প্রচার নয়, টিপুর আসল ছবিও কংগ্রেস সরকার আমাদের জানতে দেয় নি ।
 
Mithu Chatterjee র
ওয়াল থেকে সংগৃহীত
 
শেয়ার করেছেন :- প্রণব কুমার কুণ্ডু
 









প্রণব কুমার কুণ্ডু

আকবরের বিয়ে প্রথম পর্ব

 আকবরের বিয়ে প্রথম পর্ব

 

ইতিহাসের পাতা থেকে।
 
আকবরের বিয়ে প্রথম পর্ব
 
মুঘল সম্রাট আকবরের বিয়ে বাতিকের ইতিহাস সবাই নিশ্চয়ই জানেন। হ্যাঁ‚ এর আগেও কম বেশি সব রাজারাজরারই বউ‚ নিদেনপক্ষে অসংখ্য শয্যা সঙ্গিনীর শখ ছিলো! সবারই! তবে আকবর এই বিষয়টাকে আক্ষরিক অর্থেই শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যায়। ভারতের যে প্রান্তেই তার সেনাবাহিনী যেত না কেন‚ যেভাবেই হোক সেখান থেকে আকবরের জন্য একটা বউ যোগাড় করে আনতোই আনতো। এমনকি মিরিয়াম নামের এক পর্তুগিজ মেয়েকেও পর্যন্ত আকবর বিয়ে করে হেরেমে পুরেছিলো। নিজের প্যাশনের প্রতি কতটা ডেডিকেশন থাকলে তবে সেই যুগেও সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে খোদ ইউরোপে শ্বশুরবাড়ি বানানো যায় ভাবেন একবার!
যাইহোক‚ আসল কথায় আসি। বৈরাম খানের নাম নিশ্চয়ই শুনেছেন? সেই যে সম্রাট হুমায়ুনের বন্ধু! শেরশাহের কাছে ধোলাই খেয়ে হুমায়ূন যখন পারস্যের দিকে লম্বা দিচ্ছে‚ সেই মহাবিপদের দিনে যখন সবাই এক এক করে তাকে ছেড়ে যাচ্ছিলো‚ তখন একমাত্র এই বৈরাম খানই ব্যতিক্রম হয়ে ছায়ার মতো তার পাশে ছিলো! শুধু তাইই না‚ হুমায়ূনের জীবনকালে তো অবশ্যই‚ হুমায়ূনের মৃত্যুর পরও পাণিপত সহ অসংখ্য যুদ্ধে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে মুঘল বাহিনীর হয়ে জয় ছিনিয়ে এনেছিলেন এই বৈরাম খান।
তার ভেতর সব থেকে উল্লেখযোগ্য যেটা‚ একবার মুঘল ভ্রাতৃবিরোধের সময় শিশু আকবরকে অপহরণ করে তার কাকা তাকে কাবুল দুর্গের চূড়ায় বেঁধে ঝুলিয়ে রেখেছিলেন। যাতে ছেলের জীবন যাওয়ার ভয়ে হুমায়ূন দুর্গ আক্রমণ করতে না পারে। নিজের একমাত্র ছেলেকে ঐভাবে পাকা আমের মতো দোদূল ঝুলতে দেখে হুমায়ূন যখন আমার রাজ্য লাগবোনাকো‚ আমি মক্কা যামু বলে উল্টোদিকে ছুট দেওয়ার তাল করেছিলো‚ এই বৈরাম খানই তখন নিজে সামনে দাড়িয়ে থেকে দক্ষ তীরন্দাজ দের সাহায্যে আকবর কে দুর্গের চূড়ার বাঁধন কাটিয়ে নামিয়ে আনেন। অন্য সব বারের মতোই সেবারও বৈরান খান না থাকলে মুঘল বাহিনীর খবর তো ছিলোই‚ আকবরও হয়তো শিশুকালেই অক্কা পেয়ে যেত। তার আর ভারতের শ্রেষ্ঠ সম্রাট আখ্যা পাওয়া হতোনা।
.
তা পরবর্তীতে হুমায়ূন মারা গেল‚ বৈরাম খানের সাহায্যে পাণিপতের যুদ্ধে জিতে কিশোর সম্রাট হল। সবই ঠিক আছে‚ কিন্তু কিছুদিনের ভেতরেই বাধলো গ্যাঞ্জাম ! শুরু হলো প্রাসাদ ষড়যন্ত্র!
.
আকবরের বাচ্চা বেলায় মুঘল সাম্রাজ্যে দুটো লবি ছিলো‚ একটি ছিলো সুন্নি লবি‚ যার নেতৃত্বে ছিলো আকবরের ধাইমা মাহাম আগা, শিহাবুদ্দিন আতাগা, কাশিম খান, মাহাম আগার পুত্র আদম খান এবং খোদ আকবরের নিজের মা হামিদা বানু! 
আর একটি ছিলো শিয়া লবি‚ যার নেতা খোদ বৈরাম খান। 
 
এখন কিছুদিনের ভেতরেই এই দুই দলের ভেতর লাগলো ক্যাচাল আর মা - ধাইমার বুদ্ধি শুনে আকবর বৈরাম খানকে ডেকে হাতে ধরিয়ে দিলো রেজিগনেশন লেটার। কি হয়েছে? না তুমি বহুত দিন সাম্রাজ্যের সেবা করেছ‚ অনেক কষ্ট করেছ সারাজীবন এখন শেষ বয়সে মক্কায় গিয়ে ধর্মকর্মে মন দাও‚ আল্লাহর কাজে মন দাও। সোজা ভাষায়‚ তাড়াতাড়ি হিন্দুস্তান ছাড়‚ নাহলে বুড়ো তোর খবর আছে।
.
বৈরাম খান বুঝলো আকবরের ইঙ্গিত। চললো বৈরাম খান মক্কার দিকে। পথে পড়লো গুজরাট! আর এই গুজরাটেই এক পাঠানের হাতে বৈরাম খানের ইহজগতের ভিসা ক্যান্সেল হয়ে গেলো ১৫৬১ সালের জানুয়ারী মাসের ৩১ তারিখে ! আকবরের পোষা মুঘল ঐতিহাসিক দের মতে বৈরাম খান বহু আগে কোন এক আফগানের কল্লা নামিয়ে দিয়েছিলো! তারই ছেলে মোবারক খান নাকি বৈরাম খানকে মেরে পিতৃহত্যার শোধ তোলে। যদিও সেই হত্যাকারীকে কোনোদিনও ধরা যায়নি আর বৈরাম খানের মৃতদেহেরও হদিশ কোনোদিন আর পাওয়া যায়নি। তাই দুষ্টু লোকেরা বলে আকবরই নাকি লোক পাঠিয়ে বৈরাম খানকে স্বেচ্ছায় মুন্ডুদান শিবিরে বসিয়ে দেয় যাতে ভবিষ্যতে শিয়া লবির কেউ সুন্নীদের উপর খবরদারি করার আগে নিজের মুন্ডুর কথাটা অন্তত দুএকবার ভেবে নিতে পারে।
.
.
যাইহোক‚ আমাদের এই বৈরাম খানের এক স্ত্রী ছিলো সেলিমা সুলতানা! যে কিনা আবার সম্পর্কের দিক দিয়ে ছিলেন আকবরেরই পিসতুতো বোন। সেলিমা সুলতানা বেগমের মা গুলরুখ বেগম ছিলেন আকবরের বাবা হুমায়ুনের বোন !
তা বাবার বন্ধু বৈরাম খানের হত্যার পর আকবর সুলতানা বেগম কে গুজরাট থেকে দিল্লি আনার ব্যবস্থা করে আর আনা মাত্রই নিজের পিসতুতো বোন তথা পিতৃতুল্য বৈরাম খান‚ যাকে কিনা আকবর নিজেই ডাকত খান বাবা বলে‚ তার বিধবা স্ত্রী সুলতানা বেগমকে বিয়ে করে নিজের হেরেমে ঢুকিয়ে নেয়।
.
আগে এটা কিছুতেই ভেবে পেতাম না যে ভারতে এত রাজারাজরা থাকতেও আকবরকে কেন তাদের ভেতর শ্রেষ্ঠ বলা হয়। এখন মাঝেমধ্যে কেন জানিনা মনে হয় উত্তর টা আমি বুঝে গেছি।
ইতিহাস তার নিজের বাবা কে ও ক্ষমা করেনা।
আকবরের বিয়ে (প্রথম পর্ব)
+++++++++++++++++++++
মুঘল সম্রাট আকবরের বিয়ে বাতিকের ইতিহাস সবাই নিশ্চয়ই জানেন। হ্যাঁ‚ এর আগেও কম বেশি সব রাজারাজরারই বউ‚ নিদেনপক্ষে অসংখ্য শয্যা সঙ্গিনীর শখ ছিলো! সবারই! তবে আকবর এই বিষয়টাকে আক্ষরিক অর্থেই শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যায়। ভারতের যে প্রান্তেই তার সেনাবাহিনী যেত না কেন‚ যেভাবেই হোক সেখান থেকে আকবরের জন্য একটা বউ যোগাড় করে আনতোই আনতো। এমনকি মিরিয়াম নামের এক পর্তুগিজ মেয়েকেও পর্যন্ত আকবর বিয়ে করে হেরেমে পুরেছিলো। নিজের প্যাশনের প্রতি কতটা ডেডিকেশন থাকলে তবে সেই যুগেও সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে খোদ ইউরোপে শ্বশুরবাড়ি বানানো যায় ভাবেন একবার!
যাইহোক‚ আসল কথায় আসি। বৈরাম খানের নাম নিশ্চয়ই শুনেছেন? সেই যে সম্রাট হুমায়ুনের বন্ধু! শেরশাহের কাছে ধোলাই খেয়ে হুমায়ূন যখন পারস্যের দিকে লম্বা দিচ্ছে‚ সেই মহাবিপদের দিনে যখন সবাই এক এক করে তাকে ছেড়ে যাচ্ছিলো‚ তখন একমাত্র এই বৈরাম খানই ব্যতিক্রম হয়ে ছায়ার মতো তার পাশে ছিলো! শুধু তাইই না‚ হুমায়ূনের জীবনকালে তো অবশ্যই‚ হুমায়ূনের মৃত্যুর পরও পাণিপত সহ অসংখ্য যুদ্ধে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে মুঘল বাহিনীর হয়ে জয় ছিনিয়ে এনেছিলেন এই বৈরাম খান।
তার ভেতর সব থেকে উল্লেখযোগ্য যেটা‚ একবার মুঘল ভ্রাতৃবিরোধের সময় শিশু আকবরকে অপহরণ করে তার কাকা তাকে কাবুল দুর্গের চূড়ায় বেঁধে ঝুলিয়ে রেখেছিলেন। যাতে ছেলের জীবন যাওয়ার ভয়ে হুমায়ূন দুর্গ আক্রমণ করতে না পারে। নিজের একমাত্র ছেলেকে ঐভাবে পাকা আমের মতো দোদূল ঝুলতে দেখে হুমায়ূন যখন আমার রাজ্য লাগবোনাকো‚ আমি মক্কা যামু বলে উল্টোদিকে ছুট দেওয়ার তাল করেছিলো‚ এই বৈরাম খানই তখন নিজে সামনে দাড়িয়ে থেকে দক্ষ তীরন্দাজ দের সাহায্যে আকবর কে দুর্গের চূড়ার বাঁধন কাটিয়ে নামিয়ে আনেন। অন্য সব বারের মতোই সেবারও বৈরাম খান না থাকলে মুঘল বাহিনীর খবর তো ছিলোই‚ আকবরও হয়তো শিশুকালেই অক্কা পেয়ে যেত। তার আর ভারতের শ্রেষ্ঠ সম্রাট আখ্যা পাওয়া হতোনা।
.
তা পরবর্তীতে হুমায়ূন মারা গেল‚ বৈরাম খানের সাহায্যে পাণিপতের যুদ্ধে জিতে কিশোর আকবর সম্রাট হল। সবই ঠিক আছে‚ কিন্তু কিছুদিনের ভেতরেই বাধলো গ্যাঞ্জাম ! শুরু হলো প্রাসাদ ষড়যন্ত্র!
.
আকবরের বাচ্চাবেলায় মুঘল সাম্রাজ্যে দুটো লবি ছিলো‚ একটি ছিলো সুন্নি লবি‚ যার নেতৃত্বে ছিলো আকবরের ধাইমা মাহাম আগা, শিহাবুদ্দিন আতাগা, কাশিম খান, মাহাম আগার ছেলে আদম খান এবং খোদ আকবরের নিজের মা হামিদা বানু! আর একটা ছিলো শিয়া লবি‚ যার নেতা খোদ বৈরাম খান।
এখন কিছুদিনের ভেতরেই এই দুই দলের ভেতর লাগলো ক্যাচাল আর মা - ধাইমার বুদ্ধি শুনে আকবর বৈরাম খানকে ডেকে হাতে ধরিয়ে দিলো রেজিগনেশন লেটার। কি হয়েছে? না তুমি বহুত দিন সাম্রাজ্যের সেবা করেছ‚ অনেক কষ্ট করেছ সারাজীবন এখন শেষ বয়সে মক্কায় গিয়ে ধর্মকর্মে মন দাও‚ আল্লাহর কাজে মন দাও। সোজা ভাষায়‚ তাড়াতাড়ি হিন্দুস্তান ছাড়‚ নাহলে বুড়ো তোর খবর আছে।
.
বৈরাম খান বুঝলো আকবরের ইঙ্গিত। চললো বৈরাম খান মক্কার দিকে। পথে পড়লো গুজরাট! আর এই গুজরাটেই এক পাঠানের হাতে বৈরাম খানের ইহজগতের ভিসা ক্যান্সেল হয়ে গেলো ১৫৬১ সালের জানুয়ারী মাসের ৩১ তারিখে ! আকবরের পোষা মুঘল ঐতিহাসিক দের মতে বৈরাম খান বহু আগে কোন এক আফগানের কল্লা নামিয়ে দিয়েছিলো! তারই ছেলে মোবারক খান নাকি বৈরাম খানকে মেরে পিতৃহত্যার শোধ তোলে। যদিও সেই হত্যাকারীকে কোনোদিনও ধরা যায়নি আর বৈরাম খানের মৃতদেহেরও হদিশ কোনোদিন আর পাওয়া যায়নি। তাই দুষ্টু লোকেরা বলে আকবরই নাকি লোক পাঠিয়ে বৈরাম খানকে স্বেচ্ছায় মুন্ডুদান শিবিরে বসিয়ে দেয় যাতে ভবিষ্যতে শিয়া লবির কেউ সুন্নীদের উপর খবরদারি করার আগে নিজের মুন্ডুর কথাটা অন্তত দুএকবার ভেবে নিতে পারে।
.
.
যাইহোক‚ আমাদের এই বৈরাম খানের এক স্ত্রী ছিলো সেলিমা সুলতানা! যে কিনা আবার সম্পর্কের দিক দিয়ে ছিলেন আকবরেরই পিসতুতো বোন। সেলিমা সুলতানা বেগমের মা গুলরুখ বেগম ছিলেন আকবরের বাবা হুমায়ুনের বোন !
তা বাবার বন্ধু বৈরাম খানের হত্যার পর আকবর সুলতানা বেগম কে গুজরাট থেকে দিল্লি আনার ব্যবস্থা করে আর আনা মাত্রই নিজের পিসতুতো বোন তথা পিতৃতুল্য বৈরাম খান‚ যাকে কিনা আকবর নিজেই ডাকত খান বাবা বলে‚ তার বিধবা স্ত্রী সুলতানা বেগমকে বিয়ে করে নিজের হেরেমে ঢুকিয়ে নেয়।
.
আগে এটা কিছুতেই ভেবে পেতাম না যে ভারতে এত রাজারাজরা থাকতেও আকবরকে কেন তাদের ভেতর শ্রেষ্ঠ বলা হয়। এখন মাঝেমধ্যে কেন জানিনা মনে হয় উত্তর টা আমি বুঝে গেছি! 🙏🏻🙏🏻

 

👉 আমরা ভুলিনি

 👉 আমরা ভুলিনি

👉 আমরা ভুলিনি, হজ্জ নিয়ে কটুক্তির দায়ে মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী জেলে গেছেন এবং তার মন্ত্রীত্ব হারিয়েছেন।
👉 আমরা ভুলিনি, নারায়ণগঞ্জের সেই শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তের কথা। ইসলাম ধর্মকে কটুক্তির দায়ে যাকে মারধোর করেছিল তারই স্কুলের ছাত্ররা। পরে এমপি সেলিম ওসমান প্রকাশ্যে তাকে কান ধরে উঠবস করিয়েছিল।
👉 আমরা ভুলিনি, ইসলাম ধর্মকে কটুক্তির দায়ে দাউদ হায়দার ও তসলিমা নাসরিনের মত লেখক বুদ্ধিজীবীদের দেশছাড়া করার কথা।
👉 আমরা ভুলিনি, ইসলাম ধর্মকে কটুক্তির দায়ে হুমায়ূন আজাদ, অভিজিৎ রায় সহ বহু লেখক ও ব্লগারদের হত্যা করার ঘটনাগুলো।
👉 আমরা ভুলিনি, নবি তথা ইসলাম ধর্মকে কটুক্তির মিথ্যা অভিযোগ তুলে রামু, নাসিরনগর, সাঁথিয়ার মত শতশত হিন্দুগ্রাম ও মন্দির ধ্বংসের কথা।
👉 আমরা ভুলিনি, ইসলাম ধর্মকে কটুক্তির মিথ্যা অভিযোগে থানায় বন্দী শতশত হিন্দু যুবকদের কথা।
👉 আমরা ভুলিনি, ভারতের কমলেশ তেওয়ারির কথা। যাকে নবিকে অবমাননার অভিযোগে রাস্তায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করেছিল ভারতীয় উগ্রপন্থী মুসলমানরা।
👉 আমরা ভুলিনি, সম্প্রতি নবি অবমাননার নামে ভারতের বেঙ্গালুরু শহরে মুসলমানদের ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর ঘটনা।
জাফরুল্লাহ চৌধুরী কী এতই ক্ষমতাবান যে একের পর এক হিন্দুধর্মের উপর আঘাত করবে কিন্তু তাকে আইনের আওতায় আনা যাবে না? নাকি ধর্মীয় অনুভূতি শুধুমাত্র মুসলিমদের একার সম্পত্তি? হিন্দুদের কোনো অনুভূতি থাকতে নেই? ইসলাম ধর্মকে নিয়ে কটুক্তি করলে পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশ যেকোনো দেশেই হোক তার বিচার হয়, তবে হিন্দুধর্মের অবমাননা করলে তার বিচার হবে না কেন?
আর কত ঘুমাবে বাঙালী হিন্দু? এখনো কী সময় হয়নি জেগে ওঠার? হিন্দুবিদ্বেষী কুলাঙ্গার জাফরুল্লাহ'র শাস্তির দাবিতে সবাই গর্জে উঠুন।
আর হ্যাষ ট্যাগ দিয়ে লিখুন,
 
শেয়ার করেছেন :- প্রণব কুমার কুণ্ডু
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
প্রণব কুমার কুণ্ডু