বুধবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৮

জানার কথা ( দুই )


       জানার কথা ( দুই )

      ফেসবুক থেকে     শেয়ার করেছেন      প্রণব কুমার কুণ্ডু


Akash Biswas গোষ্ঠীটিতে একটি পোস্ট শেয়ার করেছেন: 💥ALL BENGAL RSS💥রাস্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ💥





শরৎকুমার পার্থ এতে Joy shree ram ☆আ‌মি হিন্দু আ‌মি গ‌র্বিত আ‌মি হিন্দু ☆ বৃহত্তম হিন্দু গ্রুপ.
আগে...
১) আরব থেকে ভারতে এসে ফ্রি'তে হিন্দু দাসদাসী ধরে নিয়ে যাওয়া যেত। কেউ একটুও রাগ করত না।
২) একই মন্দির ১৭ বার লুঠ করলেও কেউ রাগ করত না। আবার এসে লুঠ করবে, সেজন্য সোনাদানা জমা করে রাখত।
৩) পাঠানেরা দিল্লী দখল করে তিন দিনে আড়াই লক্ষ হিন্দুর মাথা কেটে দিয়ে গেল। কেউ একটুও রাগ করল না।
৪) মোগল বাদশারা বারো কোটি ভারতীয়কে আরবের বাজারে বেচে দেওয়ার পরেও কেউ রাগ করেনা। জিজিয়ার টাকায় ময়ূর সিংহাসনে বসার মজাই আলাদা।
৫) ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহ শুরু করল বিহারী ব্রাহ্মণ মঙ্গল পান্ডে। তার নেতা হিসাবে ঘোষণা করা হল মোগল বাদশা বাহাদুর শাহ এর নাম। কতই সম্প্রীতি। মঙ্গল পান্ডে শহীদ হবে আর বাদশাহী করবে মোগলেরা, যারা বৃটিশদের ডেকে এনে বসিয়েছিল।
৬) ভারতের জাতীয় কংগ্রেস যখন ভারতবাসীর অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন করছে, ভারতের মুসলমান তখন তুরষ্কের খলিফার অধিকার আদায়ের জন্য খেলাফত আন্দোলন করছে। তাতেও কোনও সমস্যা নেই। তারা দেশভক্ত।
৭) নোয়াখালির দাঙ্গায় হাজার হাজার হিন্দু মরল। গান্ধী বললেন কারও নামে মামলা করা হলে আমি রাগ করে ভাত খাবো না।
৮) কায়দে আজম জিন্নাসা'ব বললেন কাফের মেরে পাকিস্তান আদায় করবেন। গান্ধী বললেন - মুসলমান ভাইয়েরা এসে মুন্ডু কেটে নিলেও পালটা মারবে না। মারলে আমি রাগ করে ভাত খাবো না।
৯) পাকিস্তান কায়েম হবার পর তারা কাশ্মীর আর হায়দ্রাবাদ দাবী করল। গান্ধী বললেন- যেহেতু হায়দ্রাবাদের রাজা চাইছেন পাকিস্তানে যেতে অতএব জনতা না চাইলেও হায়দ্রাবাদ পাকিস্তানে যাবে। আর যেহেতু কাশ্মীরের জনসংখ্যার বেশিরভাগ মুসলমান তাই রাজা না চাইলেও কাশ্মীর পাকিস্তানে যাবে।
১০) পাকিস্তান থেকে কয়েকশো হিন্দু রিফিউজি দিল্লীতে বিভিন্ন মসজিদে শেল্টার নিয়েছিল। ভারত সরকার তাদের পুলিশ দিয়ে শীতের বৃষ্টিতে বের করে দিল। বিনা প্রতিরোধে তারা রাস্তার বসে ভিজল। যার মধ্যে ৬৮ জন নিউমোনিয়ায় মারা পড়েছিল।
১১) দেশভাগের পর পাকিস্তান করল ভারতের উপর আক্রমণ। তার বদলে ভারত সরকার পাকিস্তানকে দিল ৫৫ কোটি টাকা।
১২) ৮০০ বছরের প্রত্যক্ষ ইসলামিক শাসনে এবং স্বাধীনতার পরবর্তী ৭০ বছরে সারা ভারতে লক্ষ লক্ষ হিন্দু মন্দির ভেঙ্গে মসজিদ গড়া হল, কোন অসুবিধা হয়নি। ৯৩ তে শুধুমাত্র রাম মন্দিরকে পুনরায় মন্দিরে রূপান্তরিত করার চেষ্টা করা হল, ভারত নাকি হিন্দু রাষ্ট্র হয়ে গেল। বাংলা জুড়ে বামপন্থীরা প্রতি বছর এই দিনে রাস্তায় গলা ফাটিয়ে হিন্দুর বাপ মা উদ্ধার করে।
১৩) ২০১৪ অবধি পাকিস্তানের জঙ্গী নাশকতায় ১৮০০ ভারতীয় মারা পড়েছে। তিনবার সরাসরি আক্রমণ হয়েছে। তার পরেও ভারত সরকার পাকিস্তানের সঙ্গে কেবল আলোচনাই চালায়। পালটা আক্রমণের কোনো চেষ্টাই করেনি।
----------------------------------------
এখন অসহিষ্ণুতা যে খুবই বেড়েছে তাতে কোনো সন্দেহই নেই। দেশটা বসবাসের অযোগ্য হয়ে গেছে একেবারে। আগে সত্যই কী সুন্দর দিন ছিল।
(সংগৃহীত)

লাইকআরও প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করুন
মন্তব্য করুন

জগন্নাথ দেব



      জগন্নাথ দেব

      ফেসবুক থেকে     শেয়ার করেছেন      প্রণব কুমার কুণ্ডু
“জগন্নাথ দেবের অমৃত কথা”
পরমেশ্বর ভগবানের করুণাঘন রূপের এক রুপ হলেন জগন্নাথ অর্থাৎ জগতের নাথ। জগন্নাথধাম হিন্দু জাতির চার ধামের এক ধাম। দেবীর ৫১ পীঠের এক পীঠ। জগন্নাথদেবের বিগ্রহ দৃশ্যত অসম্পূর্ণ,কিন্তু তাঁর দৃশ্যমান হস্ত,পদ না থাকা সত্ত্বেও তিনি হস্ত-পদময়। কারণ এই জগতে এবং সকল জীবের মাঝেই তাঁর প্রকাশ। আবার তিনি এ জগতের পারে, সকল ইন্দ্রিয়ের পারে, ইন্দ্রিয়, বাক্য, মনের অগোচর হয়ে সদা বিরাজিত হয়ে আছেন ।
সারা ভারতবর্ষে যতো প্রাচীন মন্দির আছে তার প্রত্যেকটি মন্দিরে বিগ্রহের কিছু স্বতন্ত্রতা আছে। তেমনি স্বতন্ত্রতা জগন্নাথ বিগ্রহের। অপরূপ করূণাঘন চোখে তাকিয়ে আছেন ভগবান ভক্তের পানে। স্কন্ধপুরাণের উৎকল খণ্ডে জগন্নাথদেবের এ রূপের কারণ দেয়া আছে।
মালবরাজ ইন্দ্রদুম্ন্য ছিলেন পরম বিষ্ণু ভক্ত । একদিন এক তেজস্বী সন্ন্যাসী তাঁর রাজবাড়ীতে পদার্পণ করলেন । দেব দ্বিজে ভক্তিপরায়ন রাজা ইন্দ্রদুম্ন্য পরম যত্নে সন্ন্যাসীর সেবা যত্ন করলেন । সন্ন্যাসী ভারতবর্ষের সমস্ত তীর্থের কথা বলে পুরুষোত্তম ক্ষেত্রের নীল পর্বতে ভগবান বিষ্ণুর পূজার কথা জানালেন । এখানে ভগবান বিষ্ণু গুপ্তভাবে শবর দের দ্বারা নীলমাধব রূপে পূজিত হচ্ছেন । নীলমাধব সাক্ষাৎ মুক্তিপ্রদায়ক । তিনি মোক্ষ প্রদান করেন ।
সন্ন্যাসীর কথা শুনে ভগবান বিষ্ণুর ভক্ত রাজা ইন্দ্রদুম্ন্য ভগবানের রূপ দর্শনে আকুল হলেন । রাজা তাঁর পুরোহিতের ভাই বিদ্যাপতিকে শবর দের রাজ্যে গিয়ে নীলমাধবের সন্ধান করে আনতে বললেন । এরপর শবর দের দেশে এসে বিদ্যাপতি শবর দের রাজা বিশ্বাবসুর সাথে সাক্ষাৎ করলেন । বিশ্বাবসু মারফৎ বিদ্যাপতি নীলমাধব কে দর্শন লাভ করলেন । তারপর বিদ্যাপতি গিয়ে রাজাকে সব জানালেন । রাজা খবর পেয়ে সৈন্য সামন্ত নিয়ে নীলমাধবের দর্শনে আসলেন ।
ইন্দ্রদুম্ন্য পুরুষোত্তম ক্ষেত্রে এসে নীলমাধব দর্শন করতে গেলে শুনলেন নীলমাধব অন্তর্ধান করেছেন । মতান্তরে শবর রাজ বিশ্বাবসু সেটিকে লুকিয়ে রাখেন । রাজা ইন্দ্রদুম্ন্য এতে খুব দুঃখ পেয়ে ভাবলেন প্রভুর যখন দর্শন পেলাম না তখন এই জীবন রেখে কি লাভ ? অনশনে প্রান ত্যাগ করাই শ্রেয় । এই ভেবে রাজা ইন্দ্রদুম্ন্য কুশ শয্যায় শয়ন করলেন । সেসময় দেবর্ষি নারদ মুনি জানালেন – “হে রাজন তোমার প্রাণত্যাগের প্রয়োজন নাই ।
এই স্থানে তোমার মাধ্যমে ভগবান জগন্নাথ দেব দারুব্রহ্ম রূপে পূজা পাবেন । স্বয়ং পিতা ব্রহ্মা একথা জানিয়েছেন।” রাজা শুনে শান্তি পেলেন। এক রাতের কথা রাজা শয়নে ভগবান বিষ্ণুর স্বপ্ন পেলেন । স্বপ্নে ভগবান শ্রীহরি বললেন- “হে রাজন । তুমি আমার প্রিয় ভক্ত। ভক্তদের থেকে আমি কদাপি দূর হই না। আমি সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে তোমার নিকট আসছি। বাঙ্কিমুহান নামক স্থানে তুমি আমাকে দারুব্রহ্ম রূপে পাবে।” রাজা সেই স্থানে গিয়ে দারুব্রহ্মের সন্ধান পেলেন। কিন্তু তাকে একচুল ও নরাতে পারলেন না । রাজা আদেশ দিলেন হাতী দিয়ে টানতে । সহস্র হাতী টেনেও সেই দারুব্রহ্ম কে একচুল নড়াতে পারলো না ।
রাজা আবার হতাশ হলেন । সেই সময় ভগবান বিষ্ণু স্বপ্নে জানালেন- “হে রাজন। তুমি হতাশ হইও না । শবর রাজ বিশ্বাবসু আমার পরম ভক্ত । তুমি তাকে সসম্মানে এইস্থানে নিয়ে আসো। আর একটি স্বর্ণ রথ আনয়ন করো।” রাজা সেই মতো কাজ করলেন । ভক্ত বিশ্বাবসু আসলো । বিশ্বাবসু , বিদ্যাপতি আর রাজা তিনজনে মিলে দারুব্রহ্ম তুললেন । সেসময় চতুর্দিকে ভক্তেরা কীর্তন করতে লাগলো । তারপর দারুব্রহ্ম কে রথে বসিয়ে নিয়ে এলেন ।
রাজা ইন্দ্রদুম্ন্য সমুদ্রে প্রাপ্ত দারুব্রহ্ম প্রাপ্তির পর গুণ্ডিচা মন্দিরে মহাবেদী নির্মাণ করে সহস্র অশ্বমেধ যজ্ঞ করলেন । ভগবান বিষ্ণুর কৃপায় সহস্র বার ভারতবর্ষের কোনো রাজাই যজ্ঞের অশ্ব ধরতে সক্ষম হোলো না । যজ্ঞ সমাপ্তে দেবর্ষি নারদ মুনির পরামর্শে রাজা সেই দারুব্রহ্ম বৃক্ষ কাটিয়ে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা দেবীর বিগ্রহ তৈরীতে মনোনিবেশ করলেন । এর জন্য অনেক ছুতোর কারিগর কে ডেকে পাঠানো হোলো । কিন্তু বৃক্ষের গায়ে হাতুরী, ছেনি ইত্যাদি ঠেকানো মাত্রই যন্ত্র গুলি চূর্ণ হতে লাগলো । রাজা তো মহা সমস্যায় পড়লেন । সেসময় ছদ্দবেশে বিশ্বকর্মা মতান্তরে ভগবান বিষ্ণু এক ছুতোরের বেশে এসে মূর্তি তৈরীতে সম্মত হলেন । তিনি এসে বললেন- “হে রাজন। আমার নাম অনন্ত মহারাণা। আমি মূর্তি গড়তে পারবো । আমাকে একটি বড় ঘর ও ২১ দিন সময় দিন । আমি তৈরী করবো একটি শর্তে। আমি ২১ দিন দরজা বন্ধ করে কাজ করবো ।
সেসময় এই ঘরে যেনো কেউ না আসে। কেউ যেনো দরজা না খোলে।” অপর দিকে মোটা পারিশ্রামিকের লোভে যে ছুতোর রা এসেছিলো তাদের কেউ নিরাশ করলেন না অনন্ত মহারাণা । তিনি বললেন- “হে রাজন । আপনি ইতিপূর্বে যে সকল কারিগর কে এনেছেন , তাদের বলুন তিনটি রথ তৈরী করতে।” ছদ্দবেশী বিশ্বকর্মা ঘরে ঢুকলে দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে সেখানে কড়া প্রহরা বসানো হোলো যাতে কাক পক্ষীও ভেতরে না যেতে পারে । ভেতরে কাজ চলতে লাগলো । কিন্তু রানী গুণ্ডিচার মন মানে না । স্বভাবে নারীজাতির মন চঞ্চলা হয় । রানী গুন্ডিচা ভাবলেন – “আহা কেমনই বা কারিগর বদ্ধ ঘরে মূর্তি গড়ছেন । কেমন বা নির্মিত হচ্ছে শ্রীবিষ্ণুর বিগ্রহ । একবার দেখেই আসি না। একবার দেখলে বোধ হয় কারিগর অসন্তুষ্ট হবেন না।” এই ভেবে মহারানী ১৪ দিনের মাথায় মতান্তরে ৯ দিনের মাথায় দরজা খুলে দিলেন । কারিগর ক্রুদ্ধ হয়ে অদৃশ্য হোলো । অসম্পূর্ণ জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রা দেবীর মূর্তি দেখে রানী ভিরমি খেলেন । একি মূর্তি ! নীল নবঘন শ্যামল শ্রীবিষ্ণুর এমন গোলাকৃতি নয়ন , হস্ত পদ হীন, কালো মেঘের মতো গাত্র বর্ণ দেখে মহারানীর মাথা ঘুরতে লাগলো ।
রাজার কানে খবর গেলো । রাজা এসে রানীকে খুব তিরস্কার করলেন । বদ্ধ ঘরের মধ্য থেকে এক কারিগরের অদৃশ্য হয়ে যাওয়ায় বিচক্ষণ মন্ত্রী জানালেন তিনি সাধারন মানব না কোনো দেবতা হবেন । বিষ্ণু ভক্ত রাজা ইন্দ্রদুম্ন্য তাঁর আরাধ্য হরির এই রূপ দেখে দুঃখিত হলেন । রাজাকে সেই রাত্রে ভগবান বিষ্ণু আবার স্বপ্ন দিলেন । বললেন- “আমার ইচ্ছায় দেবশিল্পী মূর্তি নির্মাণ করতে এসেছিলেন । কিন্তু শর্ত ভঙ্গ হওয়াতে এই রূপ মূর্তি গঠিত হয়েছে । হে রাজন , তুমি আমার পরম ভক্ত । আমি এই অসম্পূর্ণ মূর্তিতেই তোমার পূজা নেবো । আমি দারুব্রহ্ম রূপে পুরুষোত্তম ক্ষেত্রে নিত্য অবস্থান করবো। আমি প্রাকৃত হস্তপদ রহিত , কিন্তু অপ্রাকৃত হস্তপদাদির দ্বারা ভক্তের সেবাপূজা শ্রদ্ধা গ্রহণ করবো। আমি ত্রিভুবনে সর্বত্র বিচরণ করি । লীলা মাধুর্য প্রকাশের জন্য আমি এখানে এইরূপে অধিষ্ঠান করবো। শোনো নরেশ । ভক্তেরা আমার এই রূপেই মুরলীধর শ্রীকৃষ্ণ রূপের দর্শন পাবেন । যদি তুমি ইচ্ছা করো তবে ঐশ্বর্য দ্বারা সোনা রূপার হস্ত পদাদি নির্মিত করে আমার সেবা করতে পারো। ”
ভগবান বিষ্ণু তাঁর পরম ভক্ত রাজা ইন্দ্রদুম্ন্য কে স্বপ্নে সান্ত্বনা দিচ্ছেন এই বলে যে তিনি সেই হস্তপদ রহিত বিকট মূর্তিতেই পূজা নেবেন । সেই স্বপ্ন পর্ব তখনো চলছে । ভক্ত ও ভগবানের মধ্যে যে ভাগবতিক ও ভক্তির সম্বন্ধ তা একে একে উঠে আসছে । নিদ্রিত অবস্থায় স্বপ্নে রাজা তখনও সেই ছদ্দবেশী অনন্ত মহারানার জন্য প্রার্থনা জানিয়ে বলছেন- “হে প্রভু জনার্দন । যে বৃদ্ধ কারিগরকে দিয়ে তুমি তোমার এই মূর্তি নির্মিত করিয়াছ – আমার অভিলাষ এই যে সেই কারিগরের বংশধরেরাই যেনো তোমার সেবায় রথ যুগ যুগ ধরে প্রস্তুত করিতে পারে।” ভগবান নারায়ন তাঁর ভক্তদের খুবুই স্নেহ করেন। তাই ভগবান একে একে রাজার ইচ্ছা পূর্ণ করতে লাগলেন। এরপর ভগবান বিষ্ণু বললেন- “হে রাজন। আমার আর এক পরম ভক্ত শবর রাজ বিশ্বাবসু আমাকে নীলমাধব রূপে পূজা করতো- তাঁরই বংশধরেরা আমার সেবক রূপে যুগ যুগ ধরে সেবা করবে । বিদ্যাপতির প্রথম স্ত্রীর সন্তান গন আমার পূজারী হবে। আর বিদ্যাপতির দ্বিতীয়া স্ত্রী তথা বিশ্বাবসুর পুত্রী ললিতার সন্তান এর বংশধরেরা আমার ভোগ রান্নার দায়িত্ব নেবে। আমি তাদিগের হাতেই সেবা নেবো।”
বিদ্যাপতি প্রথম রাজার আদেশে নীলমাধব সন্ধান করতে গেছিলেন শবর দের দেশে , শবর বা সাঁওতাল যাদের আমরা ছোটোজাত বলে দূর দূর করি- শ্রীভগবান বিষ্ণু প্রথম তাঁদের দ্বারাই পূজা নিলেন । অপরদিকে তিনি তাঁদের হাতে সেবার আদেশ দিলেন। ব্রাহ্মণ ও শূদ্র জাতির একত্র মেলবন্ধন ঘটালেন স্বয়ং ভগবান । সেজন্যই বলে পুরীতে জাতিবিচার নেই । জগতের নাথ জগন্নাথ সবার । বিদ্যাপতি শবর দেশে নীলমাধবের সন্ধান করতে গিয়ে বিশ্বাবসুর দুহিতা ললিতার সাথে ভালোবাসা ও বিবাহ করেছিলেন । আর বিদ্যাপতিকে শবর দেশে পৌছানোর জন্য এক রাখাল বালক বারবার পথ প্রদর্শন করেছিলেন । সেই রাখাল বালক আর কেউ নয় স্বয়ং বৃন্দাবনের রাখালরাজা নন্দদুলাল । ইন্দ্রদুম্ন্য স্বপ্নে ভগবান বিষ্ণুর কাছে প্রতিশ্রুতি দিলেন- “হে মধূসুদন । প্রতিদিন মাত্র এক প্রহর অর্থাৎ তিন ঘণ্টার জন্য মন্দিরের দ্বার বন্ধ থাকবে । বাকী সময় মন্দিরের দ্বার অবারিত থাকবে , যাতে তোমার সন্তান ভক্তেরা তোমার দর্শন লাভ করে । সারাদিন আপনার ভোজোন চলবে । আপনার হাত কদাপি শুস্ক থাকবে না।”
ভগবান বিষ্ণু রাজাকে তাই বর দিলেন। এবার ভগবান ভক্তের পরীক্ষা নিলেন- তিনি বললেন- “এবার নিজের জন্য কিছু প্রার্থনা করো। তুমি আমার ভক্ত।” প্রকৃত ভক্তেরা নিস্কাম, তাই কোনো প্রকার সুখ ঐশ্বর্য তারা চান না। রাজা একটি ভয়ানক বর চেয়ে বললেন- “প্রভু আমাকে এই বর দিন আমি যেনো নির্বংশ হই । যাতে আমার বংশধরেরা কেউ যেনো আপনার দেবালয় কে নিজ সম্পত্তি দাবী না করতে পারে।” ভগবান হরি তাই বর দিলেন। জগন্নাথ মন্দিরে প্রান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন প্রজাপতি ব্রহ্মা।
সরলাদাসের ওড়িয়া মহাভারত, বলরাম দাসের ওড়িয়া রামায়ন, জগন্নাথ দাসের দারুব্রহ্মগীতা, অচ্যুতানন্দ দাসের হরিবংশ, দিবাকর দাসের জগন্নাথ চরিতামৃত, মহাদেব দাসের নীলাদ্রী মহোদয় ইত্যাদি গ্রন্থে জগন্নাথ দেব সম্বন্ধে বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যায়। সংস্কৃতে রচিত নীলাদ্রী মহোদয়, বামদেব সংহিতা, যাত্রা ভাগবত ইত্যাদি শাস্ত্রে জগন্নাথের কথা দেখা যায় । পদ্মপুরাণে লিখিত আছে ভগবান রামচন্দ্রের কনিষ্ঠ ভ্রাতা শত্রুঘ্ন এই স্থানে এসেছিলেন । ব্রহ্ম পুরাণ ও বৃহৎ নারদীয় পুরানে এই স্থানের নাম পাওয়া যায় ।
জগন্নাথ মন্দিরের মূর্তি প্রতিষ্ঠার পরিপ্রেক্ষিতে বলা হয় ব্রহ্মা ব্রহ্মলোক থেকে মর্তে এসেছিলেন। তিনিই হয়েছিলেন পুরোহিত । জগন্নাথ দেব রাজা ইন্দ্রদুম্ন্য কে স্বপ্নে নিত্য পূজোর নিয়মকানুনাদি বলেছিলেন । ইন্দ্রদুম্ন্য সেই মতো সব ব্যবস্থা করেন । স্কন্দপুরান মতে শবর জাতির লোকেরা পূর্বে নীলমাধব রূপে ভগবান বিষ্ণুর পূজা করতো । ব্রহ্ম পুরাণ ও বৃহৎ নারদীয় পুরান মতে শবর গণ নীলমাধব রূপী নারায়নের পূজা করতেন ঠিকই কিন্তু তাঁর পূর্বে স্বর্গের দেবতা গণ গুপ্ত রূপে নীলমাধবের পূজা করতেন । পরে শবর গণ সেই খোঁজ পান । জগন্নাথ দেবের সৃষ্টি সম্বন্ধে ওড়িয়া মহাভারতে এক অদ্ভুত আখ্যান আছে । লীলা সংবরণের আগে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বৈকুণ্ঠে গমনের চিন্তা করতে লাগলেন। যদু বংশ গৃহযুদ্ধে ধ্বংস হয়েছে । বলরাম ভ্রাতা যোগবলে দেহ রেখেছেন । তিনি এই ভেবে বনে গিয়ে একটি বৃক্ষে আরোহণ করে মহাভারতের কথা চিন্তা করতে লাগলেন। সেসময় তাঁর চরণ কে পক্ষী ভেবে জরা নামক এক ব্যাধ শর বিদ্ধ করলেন ।
বলা হয় এই ব্যাধ পূর্ব জন্মে বালী পুত্র অঙ্গদ ছিলেন । ভগবান রাম বালীকে বধ করে অঙ্গদ কে বর দিয়েছিলেন , পরবর্তী কৃষ্ণ রূপে তিনি অঙ্গদের শরে দেহ রাখবেন । পরে শ্রীকৃষ্ণ দেহ রাখলে তাঁর দেহকে দ্বারকায় সমুদ্র তটে চন্দন কাষ্ঠে, খাঁটি গো ঘৃতে দাহ করার চেষ্টা করা হয় । কিন্তু ৬ দিন হলেও ভগবানের শরীর একটুকুও পুড়লো না । তখন দৈববাণী হোলো- “ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই নশ্বর দেহ আগুনে দাহ করা যাবে না। এই পবিত্র দেহ সমুদ্রে বিসর্জন দাও।” ঠিক সেই মতো সমুদ্রে বিসর্জিত করা হলে সেই দেহ কাষ্ঠে রূপান্তরিত হয়ে ভাসতে ভাসতে এলো । সেই কাষ্ঠ রোহিনীকুণ্ডে পাওয়া যায়। সেই কাষ্ঠ দিয়েই জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা দেবীর বিগ্রহ তৈরী হোলো ।
জগন্নাথদেব সনাতন হিন্দুর শাক্ত, শৈব,গাণপত্য, সৌর এবং বৈষ্ণব এ পঞ্চ মতেরই একত্বের প্রতীক। বলদেব শিবের, শুভদ্রা শক্তির, জগন্নাথ বিষ্ণু, আর সুদর্শন সূর্যের প্রতীক বলে উপাসনা করা হয়। পঞ্চমতের মধ্যে বাকি রইল একটি গাণপত্য। তাই স্নানযাত্রার দিনে জগন্নাথদেবকে গণেশরূপে উপাসনা করা হয়। আবার জগন্নাথদেবের যেহেতু দৃশ্যমান হস্ত-পদ নেই, তাই তিনি হস্ত-পদের পারে ব্রহ্মস্বরূপ। এবং তাঁর বিগ্রহকে বলা হয় দারুব্রহ্ম।
জগন্নাথদেবের মন্দির শুধুমাত্র হিন্দুদের সকল মত-পথের একতার প্রতীকই নয় ; হিন্দু জাতির একতা গঠনে অনন্য ভূমিকা রেখেছে। জগন্নাথদেবের গর্ভগৃহে সকল হিন্দুদের সহ ভারতে উৎপন্ন বৌদ্ধ, জৈন,শিখসহ সকল ধর্মাবলম্বীদেরই প্রবেশের অধিকার । (শুধুমাত্র সেমেটিক ধর্মাবলম্বীদের প্রবেশাধিকার নেই, কারণ তারা সুযোগের অসৎ ব্যাবহার করে প্রচুর অসভ্যতা করেছে বিভিন্ন সময়।) জগন্নাথদেবের প্রসাদ ব্রাহ্মণ-শূদ্র (কথিত) নিবির্শেষে সকলে এক সাথে, এক পাতে বসে গ্রহণ করে।
যেখানে জগন্নাথদেবের প্রসাদ পাওয়া যায়, সেই স্থানের নাম আনন্দবাজার। অপূর্ব নামকরণ! এ যেন একতার আনন্দবাজার। এ যেন জাত-পাতের রাজনীতিকে একপাশ রেখে হিন্দুত্বের মিলনের আনন্দবাজার।
জগন্নাথদেবের পূজা হয় দ্বৈতভাবে, ব্রাহ্মণ পাণ্ডাদের রীতিতে এবং শূদ্র শবরদের রীতিতে। সকলেই সমান সমান অংশগ্রহণকারী জগন্নাথদেবের উপাসনায়। সাধারণত দেবতা থাকে মন্দিরে আর ভক্তরা এসে বিগ্রহকে প্রণাম করে, উপাসনা করে। কিন্তু জগন্নাথদেব এর ব্যতিক্রম তিঁনি সাধারণজনের মাঝে সাধারণজন হয়ে রাজপথে নেমে এসেছেন। তিঁনি তো রাজাধিরাজ তিঁনিই যখন নেমে এসেছেন রাজপথে, তখন দেশের রাজার তো সাধ্য নেই রাজসিংহাসনে বসে থাকার। তিনিও চলে এসেছেন রাজপথে সাধারনজনের কাছে। হাতে ঝাড়ু নিয়ে হয়েছেন জগন্নাথদেবের পথের ঝাড়ুদার। রাজা- প্রজা সকলেই আজ একাকার! অপূর্ব সাম্যবাদের শিক্ষা।
‘উৎকলখণ্ড’ এবং ‘দেউল তোলা’ নামক ওড়িশার প্রাচীন পুঁথিতে জগন্নাথদেবের রথযাত্রার ইতিহাস প্রসঙ্গে বলা হয়েছে যে এই রথযাত্রার প্রচলন হয়েছিল প্রায় সত্যযুগে। সে সময় আজকের ওড়িশার নাম ছিল মালবদেশ। সেই মালবদেশের অবন্তীনগরী রাজ্যে ইন্দ্রদ্যুম্ন নামে সূর্যবংশীয় এক পরম বিষ্ণুভক্ত রাজা ছিলেন, যিনি ভগবান বিষ্ণুর এই জগন্নাথরূপী মূর্তির রথযাত্রা শুরু করার স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন। পরবর্তিকালে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন পুরীর এই জগন্নাথ মন্দির নির্মাণ ও রথযাত্রার প্রচলন করেন।
বৈষ্ণবীয় দর্শন মতে, একদা দ্বারকায় মহিষীগণ রোহিনী মাতাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে এত সেবা করার পরও তিনি যেন শ্রীদাম-সুদাম, কখনও মা যশোদা-নন্দ বা কখনও ব্রজবাসীগণ বলতে মুর্ছা যান। তার কারণ কি? তখন মাতা রোহিণী সুভদ্রাকে বললেন তুমি একটু দরজার বাইরে থাকো। এ বর্ণনা তুমি সইতে পারবে না। সুভদ্রাকে বাইরে রেখে মাতা রোহিণী মহিষীদেরকে বলতে লাগলেন কৃষ্ণ বিহনে বৃন্দাবনের তরু-লতা-পশু-পাখি কিভাবে হা-কৃষ্ণ হা-কৃষ্ণ বলে কাঁদছে, কিভাবে মূর্ছা যাচ্ছে নগরবাসীরা। সখাগণ অনাহারে অনিদ্রায় কালাতিপাত করছে। মা যশোদা, পিতা নন্দ প্রতিদিন ছানা-মাখন নিয়ে গোপাল গোপাল বলে কাঁদতে কাঁদতে অন্ধ হয়ে গেছেন। কৃষ্ণবিহনে ব্রজগোপীগণ প্রাণান্তপ্রায়। এদিকে ভগিনী সুভদ্রা দেবীকে একটি কক্ষের দ্বারে দেখতে পেয়ে কৃষ্ণ এবং বলরাম তাঁর নিকটে এসে দাঁড়ালেন। কক্ষাভ্যন্তর থেকে ভেসে আসা ধ্বনি, রোহিনী মাতা কর্তৃক বর্ণিত ব্রজবাসীদের কৃষ্ণ-বিরহ কথা শ্রবণ করতে করতে কৃষ্ণ, বলরাম এবং সুভদ্রা বিকারগ্রস্ত হতে লাগলেন। তাদের হস্ত-পদ শরীরাভ্যন্তরে প্রবিষ্ট হতে লাগল। চক্ষুদ্বয় বিস্ফারিত হতে লাগল।
এমতাবস্থায় সেখানে নারদ মুনি উপস্থিত হয়ে সেই রূপ দর্শন করলেন। তখন নারদ মণি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নিকট প্রার্থনা করলেন, হে ভগবান, আমি আপনার যে রূপ দর্শন করলাম, যে ভক্ত বিরহে আপনি স্বয়ং বিকারগ্রস্ত হয়ে থাকেন, সেই করুণার মূর্তি জগতবাসীর কাছে প্রকাশ করুন। নারদ মুণির প্রার্থনায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে প্রতিশ্রুতি দিলেন যে, দারুবৃক্ষ (জগন্নাথ) রূপে শ্রীক্ষেত্র বা পুরীতে আমি এই রূপে আবির্ভূত হবো।
ওড়িশা ভারতের এক প্রাচীন রাজ্য। এখানকার সংস্কৃতি ও সভ্যতা অনেক পুরানো । জগন্নাথ যেমন বৈষ্ণব দের নিকট বিষ্ণু তেমনি শাক্ত ও শৈবদের নিকট ভৈরব শিব । যে যেমন ভাবে দেখতে চায়- জগন্নাথ তাঁর কাছে সেরূপেই প্রকাশিত হন। হরিহর অভেদ তত্ত্ব এই শ্রীক্ষেত্রে দেখা যায় । ওড়িশার নানা অঞ্চল জুড়ে বহু প্রাচীন মন্দির আছে । এগুলোর সবকটি সম্বন্ধে লেখা অসম্ভব । কি শিব মন্দির, কি শক্তিপীঠ, কি গোপাল মন্দির এমনকি বৌদ্ধ ও জৈণ ধর্মের নিদর্শন ওড়িশা রাজ্য জুড়ে দেখা যায় । আসুন জেনে নেই পুরীধামে কি কি দেখবার প্রধান জায়গা আছে ।
জগন্নাথ মন্দির দর্শন সেড়ে “মার্কণ্ডেয় পুষ্করিণী” পুরান গুলি বিশেষত স্কন্দপুরাণে লেখা আছে ভগবান হরির নির্দেশে মার্কণ্ড মুনি এই পুষ্করিণী খনন করেছিলেন , এখানে অনেক ঘাট, শিব মন্দির অষ্ট মাতৃকা মন্দির আছে । এবার দর্শনীয় স্থান ইন্দ্রদুম্ন্য সরোবর । মহারাজ ইন্দ্রদুম্ন্য অশ্বমেধ যজ্ঞ করার সময় ব্রাহ্মণ দের যে গাভী দান করেছিলেন সেই গাভীগুলির ক্ষুরের আঘাতে এই পুষ্করিণী সৃষ্টি হয় ও গোমূত্র, জলে পুষ্করিণী ভরাট হয় । এই জলের দ্বারা মহাপ্রভু তাঁর পার্ষদ সহিত গুণ্ডিচা মন্দির মার্জন করতেন । এরপর “মহাদধি সমুদ্র” । পুরাণ মতে মা লক্ষ্মীর আবির্ভাব সমুদ্র মন্থন থেকে হয়েছিলো। বলা হয় এইস্থানে মা লক্ষ্মী প্রকট হয়েছিলেন । জগন্নাথের স্ত্রী লক্ষ্মী দেবীর আবির্ভাব এইস্থানে হওয়ায় ওড়িশা বাসী হাস্যচ্ছলে এইস্থান কে জগন্নাথের শ্বশুর গৃহ বলেন । এই স্থানেই মহাপ্রভু পরম ভক্ত হরিদাস ঠাকুরকে সমাধিস্থ করেন বালি দিয়ে ।
এরপর “নরেন্দ্র পুষ্করিণী” । এটিকে জগন্নাথ দেবের পিসির বাড়ী বলা হয় । পিসি হলেন কুন্তী । মহাভারতে কিছু স্থানে দেখা যায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কুন্তীদেবীকে ‘পিসি’ সম্বোধন করতেন । এখানে জগন্নাথ দেব এসে মালপোয়া সেবা নেন। এখানেই প্রভুর চন্দনযাত্রা হয় । তারপর আছে “শ্বেতগঙ্গা” বলা হয় এখানে মা গঙ্গা অবস্থান করেন। এখানে স্নানে গঙ্গা স্নানের ফল পাওয়া যায় । এখানে ভগবান মৎস্য ও মা গঙ্গার মন্দির আছে । এরপর স্বর্গদ্বার সমুদ্র তট । অপরূপ সৌন্দর্য মণ্ডিত সমুদ্র তট । সমুদ্র চরে বসে আপনার মন কোনো এক মধুমাখা কল্পনা লোকে চলে যাবে, হোটেলের বেলকোণি থেকে এই সমুদ্র তরঙ্গ দেখতে দেখতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় যেনো কেটে যায়, বিরক্ত আসে না ।
এছাড়া সার্বভৌম আচার্যের বাড়ী, গম্ভীরা গুলি দর্শনীয় স্থান । এছাড়া আরোও অনেক বহু প্রাচীন মন্দির বিরাজিত । জগন্নাথ ক্ষেত্র বা ওড়িশা বা ঔড্র দেশ বা নীলাচল ধাম অপূর্ব সুন্দর ক্ষেত্র ।
শ্রীপাদ শঙ্করাচার্য, শ্রীরামানুজাচার্য,শ্রীচৈতন্যদেব সহ আমাদের প্রায় সকল আচার্যবৃন্দেরই উপাসনার, সাধনার স্থান ছিলো জগন্নাথ ধাম। তাই আমাদের প্রায় সকল আচার্যবৃন্দই শ্রীক্ষেত্র/পুরুষোত্তম ক্ষেত্র /শঙ্খক্ষেত্র /নীলাচল ক্ষেত্র /মুক্তিক্ষেত্র ইত্যাদি বিভিন্ন নামে অভিহিত জগন্নাথধামের মাহাত্ম্যকথা প্রচার করেছেন এবং জগন্নাথদেবের মাহাত্ম্যযুক্ত স্তোত্র রচনা করেছেন।
পরিশেষে শ্রীপাদ শঙ্করাচার্যের ভাষায় শ্রীজগন্নাথদেবের কাছে প্রার্থনা জানাই:
হে জগন্নাথদেব তুমি আমার নয়নপথে আসো!
তোমার কৃপাঘন ওই গোলাকার চখা-চখা
কমল নয়নকে কবে আমি আপন করে
আমার হৃদয়মাঝে পাব?
জয় জগন্নাথ ।
জয়ন্ত কর্মকার ,
উল্টো রথযাত্রা, ২২-০৭-২০১৮



লাইকআরও প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করুন
মন্তব্য করুন

সোমবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১৮

মুহম্মদ শহীদুল্লাহ


    মুহম্মদ শহীদুল্লাহ


     ফেসবুক থেকে    শেয়ার করেছেন      প্রণব কুমার কুণ্ডু

সাহিত্যিক, ভাষাবিদ, গবেষক এবং দার্শনিক
মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (জন্মঃ- ১০ জুলাই, ১৮৮৫ - মৃত্যুঃ- ১৩ জুলাই, ১৯৬৯)(সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান অনুযায়ী)
এন্ট্রান্স পাশের সময় থেকেই তিনি বিভিন্ন ভাষার প্রতি অতি উৎসাহী ও আগ্রহী হয়ে উঠেন এবং একাধিক ভাষা শিক্ষা শুরু করেন। বাংলা ভাষার আদর্শ অভিধান প্রকল্পের সম্পাদক হিসেবে বাংলা একাডেমিতে যোগ দেন। ১৯৬১-৬৪ সাল পর্যন্ত বাংলা একাডেমির বিশ্বকোষ প্রকল্পের অস্থায়ী সম্পাদক পদে নিযুক্ত হন। ১৯৬৩ সালে বাংলা একাডেমি কর্তৃক গঠিত বাংলা একাডেমির পঞ্জিকার তারিখ বিন্যাস কমিটির সভাপতি নিযুক্ত হন। তাঁর নেতৃত্বে বাংলা পঞ্জিকা একটি আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত রূপ পায়। ১৯১৯ থেকে ১৯২১ সাল পর্যন্ত ডক্টর দীনেশ চন্দ্র সেনের সহকর্মী হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষক হিসেবে কাজ করেন। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। পাশাপাশি একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯২২ থেকে ১৯২৪ সালে পর্যন্ত আইন বিভাগে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। ফ্রান্সের সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯২৮ সালে পি.এইচডি ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৩৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও রিডার হিসেবে নিযুক্ত হন। সেখান থেকে ১৯৪৪ সালে অবসর গ্রহণ করেন। অবসরের পর তিনি বগুড়ার সরকারী আজিজুল হক কলেজে প্রিন্সিপাল হিসেবে যোগ দেন। ১৯৫৩ - ১৯৫৫ সালে তিনি পুনরায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ফরাসি ভাষার খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসাবে কাজ করেন। ১৯৫৫ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত ও পালি বিভাগে যোগদান করে ১৯৫৮ সালে অবসর গ্রহণ করেন।
জন্ম
তিনি পশ্চিমবঙ্গের অবিভক্ত চব্বিশ পরগণা জেলার পেয়ারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯০৪ সালে হাওড়া জেলা স্কুল থেকে এন্ট্রান্স এবং ১৯০৬ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এফ.এ (বর্তমান এইচএসসি’র সমমান) পাশ করেন। ১৯১০ সালে সিটি কলেজ, কলকাতা থেকে সংস্কৃতে সম্মান-সহ বি.এ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুলনামূলক দর্শনতত্ত্বে এম.এ (১৯১২) ডিগ্রী অর্জন। এছাড়াও, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সরবন বিশ্ববিদ্যালয়, প্যারিস থেকে পি.এইচডি ডিগ্রী (১৯২৫) লাভ করেন। পড়াশোনা শেষ করার পূর্বেই কিছুকাল তিনি যশোর জেলা স্কুলে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। ১৯১৫ থেকে ১৯১৯ সাল পর্যন্ত চব্বিশ পরগণার বশিরহাটে আইন ব্যবসা করেন। তিনি সবসময়ই সাহিত্য কর্মকান্ডের সাথে যুক্ত ছিলেন। এম.এ পাশ করার পরই তিনি বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির সম্পাদক হন। ১৯৪৮ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনের সভাপতি ছিলেন।
ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ অনেক বই লিখেছেন।
তাঁর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো -
ভাষা ও সাহিত্য
বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত
দীওয়ানে হাফিজ
রুবাইয়াত-ই-ওমর খৈয়াম
বিদ্যাপতি শতক
বাংলা সাহিত্যের কথা (২ খণ্ড)
বাংলা ভাষার ব্যাকরণ
বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান
ভাষা আন্দোলনে ভূমিকা
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরই দেশের রাষ্ট্রভাষা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হলে বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করার পক্ষে যে ক’জন ব্যক্তি জোরালো বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। তাঁর এই ভূমিকার ফলে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পথ অনেকখানিই প্রশস্ত হয়।
পুরস্কার
ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম এমেরিটাস অধ্যাপক পদ লাভ করেন। একই বছর ফ্রান্স সরকার তাকে সম্মানজনক পদক নাইট অফ দি অর্ডারস অফ আর্টস অ্যান্ড লেটার্স দেয়।
মৃত্যু
১৯৬৯ সালের ১৩ জুলাই ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের পাশে সমাহিত করা হয়। ভাষাক্ষেত্রে তাঁর অমর অবদানকে সম্মান ও শ্রদ্ধা জানাতে ঐ বছরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ঢাকা হলের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় শহীদুল্লাহ হল। এছাড়াও তাঁর নামে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি কলা ভবনের নামকরন করা হয়।

কবি, সাহিত্যিক এবং সম্পাদক আহসান হাবীব (জন্মঃ- ২ জানুয়ারি, ১৯১৭ - মৃত্যুঃ- ১০ জুলাই, ১৯৮৫)


কবি, সাহিত্যিক এবং সম্পাদক
আহসান হাবীব (জন্মঃ- ২ জানুয়ারি, ১৯১৭ - মৃত্যুঃ- ১০ জুলাই, ১৯৮৫)


ফেসবুক থেকে   শেয়ার করেছেন    প্রণব কুমার কুণ্ডু


Pratap C Saha


কবি, সাহিত্যিক এবং সম্পাদক
আহসান হাবীব (জন্মঃ- ২ জানুয়ারি, ১৯১৭ - মৃত্যুঃ- ১০ জুলাই, ১৯৮৫)

দীর্ঘ দিন দৈনিক বাংলা পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক পদের দায়িত্ব পালন সূত্রে তিনি স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সাহিত্য অঙ্গনে অভিভাবকের ভূমিকা রেখেছেন। তিনি পঞ্চাশ দশকের অন্যতম প্রধান আধুনিক কবি হিসেবে পরিগণিত। স্কুলে পড়ার সময়ই ১৯৩৩ সালে স্কুল ম্যাগাজিনে তাঁর একটি প্রবন্ধ ধরম প্রকাশিত হয়। ১৯৩৪ সালে তাঁর প্রথম কবিতা মায়ের কবর পাড়ে কিশোর পিরোজপুর গভর্নমেন্ট স্কুল ম্যাগাজিনে ছাপা হয়। পরবর্তী সময়ে ছাত্রাবস্থায় কলকাতার কয়েকটি সাহিত্য পত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়। স্কুলে পড়াকালীন তিনি প্রবন্ধ প্রতিযোগিতার বিষয়বস্তুকে কবিতায় উপস্থাপিত করে পুরস্কৃত হয়েছিলেন। ততদিনে অবশ্য দেশ, মোহাম্মদী, বিচিত্রার মতো নামি দামি পত্রপত্রিকায় তাঁর বেশ কিছু লেখা প্রকাশিত হয়ে গেছে। কলকাতা গিয়ে শুরু হয় আহসান হাবীবের সংগ্রামমুখর জীবনের পথচলা। তিনি কলকাতায় এসে ১৯৩৭ সালে দৈনিক তকবির পত্রিকার সহ-সম্পাদকের কাজে নিযুক্ত হন। বেতন মাত্র ১৭ টাকা। পরবর্তীতে তিনি ১৯৩৭ সাল থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত কলকাতার বুলবুল পত্রিকা ও ১৯৩৯ সাল থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত মাসিক সওগাত পত্রিকায় কাজ করেন। এছাড়া তিনি আকাশবাণীতে কলকাতা কেন্দ্রের স্টাফ আর্টিস্ট পদে ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত কাজ করেন।

তাঁর জন্ম পিরোজপুরের শংকরপাশা গ্রামে। পিতার নাম হামিজুদ্দীন হাওলাদার। মাতা জমিলা খাতুন। পারিবারিক ভাবে আহসান হাবীব সাহিত্য সংস্কৃতির আবহের মধ্যে বড় হয়েছেন। সেই সূত্রে বাল্যকাল থেকেই লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। সেইসময় তাঁর বাড়িতে ছিল আধুনিক সাহিত্যের বইপত্র ও কিছু পুঁথি। এসব পড়তে পড়তে একসময় নিজেই কিছু লেখার তাগিদ অনুভব করেন। সাহিত্যের অনুকূল পরিবেশ নিয়ে পিরোজপুর গভর্নমেন্ট স্কুল থেকে ১৯৩৫ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর তিনি চলে আসেন বরিশালে। ভর্তি হন সেখানকার বিখ্যাত বিএম কলেজে। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকটের কারণে কলেজের পড়াশোনার পাঠ শেষ পর্যন্ত অসমাপ্ত রাখতে হয় তাঁকে। বিএম কলেজে দেড় বছর পড়ার পর ১৯৩৬ সালের শেষার্ধে কাজের খোঁজে তিনি রাজধানী কলকাতায় পাড়ি জমান। এভাবেই কবি আহসান হাবীবের বরিশাল থেকে তত্কাললীন রাজধানী কলকাতায় পদার্পণ।

রচনাবলী
কাব্যগ্রন্থ, বড়দের উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, ছোটদের ছড়া ও কবিতার বই সব মিলিয়ে আহসান হাবীবের বইয়ের সংখ্যা ২৫টি।
কবিতা
রাত্রিশেষ (১৯৪৮)
ছায়াহরিণ (১৯৬২)
সারা দুপুর (১৯৬৪)
আশায় বসতি (১৯৭৪)
মেঘ বলে চৈত্রে যাবো (১৯৭৬)
দু'হাতে দুই আদিম পাথর (১৯৮০)
প্রেমের কবিতা (১৯৮১)
বিদীর্ণ দর্পনে মুখ (১৯৮৫)
উপন্যাস
রাণী খালের সাঁকো
আরণ্য নীলিমা
শিশু সাহিত্য
জোছনা রাতের গল্প
ছুটির দিন দুপুরে
বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর
ছুটির দিন দুপুরে
রেলগাড়ি ঝমামমে
রাণীখালের সাঁকো
জোৎসনা রাতের গল্প
ছোট মামা দি গ্রেট
পাখিরা ফিরে আসে
রত্নদ্বীপ ( ট্রেজার আইল্যান্ডর সংৰিপ্ত অনুবাদ )
হাজীবাবা
প্রবাল দ্বীপে অভিযান ( কোরাল আইল্যান্ডর সংৰিপ্ত অনুবাদ )
সম্পাদিত গ্রন্থ
কাব্যলোক
বিদেশের সেরা গল্প

পুরস্কার
ইউনেস্কো সাহিত্য পুরস্কার ও একাডেমী পুরস্কার (১৯৬১)
আদমজী পুরস্কার (১৯৬৪)
নাসির উদ্দিন স্বর্ণপদক (১৯৭৭)
একুশে পদক (১৯৭৮)
আবুল মনসুর আহমদ স্মৃতি পুরস্কার (১৯৮০)
স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার
বাংলা একাডেমী পুরস্কার

রূপকথা -আহসান হাবীব

খেলাঘর পাতা আছে এই এখানে,
স্বপ্নের ঝিকিমিকি আঁকা যেখানে।
এখানে রাতের ছায়া ঘুমের নগর,
চোখের পাতায় ঘুম ঝরে ঝরঝর।
এইখানে খেলাঘর পাতা আমাদের,
আকাশের নীল রং ছাউনিতে এর।
পরীদের ডানা দিয়ে তৈরি দেয়াল,
প্রজাপতি রং মাখা জানালার জাল।
তারা ঝিকিমিকি পথ ঘুমের দেশের,
এইখানে খেলাঘর পাতা আমাদের।ছোট বোন পারুলের হাতে রেখে হাত,
সাতভাই চম্পার কেটে যায় রাত।
কখনও ঘোড়ায় চড়ে হাতে নিয়ে তীর,
ঘুরে আসি সেই দেশ চম্পাবতীর।
এই খানে আমাদের মানা কিছু নাই,
নিজেদের খুশি মত কাহিনী বানাই।

আমি কোনো আগন্তুক নই -আহসান হাবীব
আসমানের তারা সাক্ষী
সাক্ষী এই জমিনের ফুল, এই
নিশিরাইত বাঁশবাগান বিস্তর জোনাকি সাক্ষী
সাক্ষী এই জারুল জামরুল, সাক্ষী
পূবের পুকুর, তার ঝাকড়া ডুমুরের পালেস্থিরদৃষ্টি
মাছরাঙা আমাকে চেনে
আমি কোনো অভ্যাগত নই
খোদার কসম আমি ভিনদেশী পথিক নই
আমি কোনো আগন্তুক নই
আমি কোনো আগন্তুক নই, আমি
ছিলাম এখানে, আমি স্বাপ্নিক নিয়মে
এখানেই থাকি আর
এখানে থাকার নাম সর্বত্রই থাকা –
সারা দেশে।
আমি কোনো আগন্তুক নই। এই
খর রৌদ্র জলজ বাতাস মেঘ ক্লান্ত বিকেলের
পাখিরা আমাকে চেনে
তারা জানে আমি কোনো অনাত্মীয় নই।
কার্তিকের ধানের মঞ্জরী সাক্ষী
সাক্ষী তার চিরোল পাতার
টলমল শিশির, সাক্ষী জ্যোৎস্নার চাদরে ঢাকা
নিশিন্দার ছায়া
অকাল বার্ধক্যে নত কদম আলী
তার ক্লান্ত চোখের আঁধার
আমি চিনি, আমি তার চিরচেনা স্বজন একজন। আমি
জমিলার মা’র
শূন্য খা খা রান্নাঘর শুকনো থালা সব চিনি
সে আমাকে চেনে
হাত রাখো বৈঠায় লাঙ্গলে, দেখো
আমার হাতের স্পর্শ লেগে আছে কেমন গভীর। দেখো
মাটিতে আমার গন্ধ, আমার শরীরে
লেগে আছে এই স্নিগ্ধ মাটির সুবাস।
আমাকে বিশ্বাস করো, আমি কোনো আগন্তুক নই।
দু’পাশে ধানের ক্ষেত
সরু পথ
সামনে ধু ধু নদীর কিনার
আমার অস্তিত্বে গাঁথা। আমি এই উধাও নদীর
মুগ্ধ এক অবোধ বালক।

স্বদেশ -আহসান হাবীব
এই যে নদী
নদীর জোয়ার
নৌকা সারে সারে,
একলা বসে আপন মনে
বসে নদীর ধারে
এই ছবিটি চেনা।
মনের মধ্যে যখন খুশি
এই ছবিটি আঁকি
এক পাশে তার জারুল গাছে
দু’টি হলুদ পাখি,এমনি পাওয়া এই ছবিটি
কড়িতে নয় কেনা।
মাঠের পরে মাঠ চলেছে
নেই যেন এর শেষ
নানা কাজের মানুষগুলো
আছে নানান বেশ,
মাঠের মানুষ যায় মাঠে আর
হাটের মানূষ হাটে,
দেখে দেখে একটি ছেলের
সারাটাদিন কাটে।
এই ছেলেটির মুখ
সারাদেশের সব ছেলেদের
মুখেতে টুকটুক।
কে তুমি ভাই,
প্রশ্ন করি যখন,
ভালবাসার শিল্পী আমি,
বলবে হেসে তখন।
এই যে ছবি এমনি আঁকা
ছবির মত দেশ,
দেশের মাটি দেশের মানুষ
নানান রকম বেশ,
বাড়ি বাগান পাখ-পাখালি
সব মিলে এক ছবি,
নেই তুলি নেই রং তবুও
আঁকতে পারি সবই।

ছড়া -আহসান হাবীব
ঝাউয়ের শাখায় শন শন শন
মাটিতে লাটিম বন বন বন
বাদলার নদী থৈ থৈ থৈ
মাছের বাজার হৈ হৈ হৈ।
ঢাকিদের ঢাক ডুমডুমাডুম
মেঘে আর মেঘে গুড়ুমগুড়ুম
দুধকলাভাত সড়াত সড়াত
আকাশে বাজে চড়াৎ চড়াৎ।
ঘাস বনে সাপ হিস হিস হিস
কানে কানে কথা ফিস ফিস ফিস
কড়কড়ে চটি চটাস চটাস
রেগেমেগে চড় ঠাস ঠাস ঠাস।
খোপের পায়রা বকম বকম
বিয়েমজলিশ গম গম গম
ঘাটের কলসি বুট বুট বুট
আঁধাঁরে ইঁদুর কুট কুট কুট।
বেড়ালের ছানা ম্যাও ম্যাও ম্যাও
দু দিনের খুকু ওঁয়াও ওঁয়াও।

ইচ্ছা -আহসান হাবীব
মনারে মনা কোথায় যাস?
বিলের ধারে কাটব ঘাস।
ঘাস কি হবে?
বেচব কাল,
চিকন সুতোর কিনব জাল।
জাল কি হবে?
নদীর বাঁকে
মাছ ধরব ঝাঁকে ঝাঁকে।
মাছ কি হবে?
বেচব হাটে,
কিনব শাড়ি পাটে পাটে।
বোনকে দেব পাটের শাড়ি,
মাকে দেব রঙ্গিন হাঁড়ি।

শরতে -আহসান হাবীব
ফূল ফুল তুল তুল গা ভেজা শিশিরে,
বুল বুল মশগুল, কার গান গাহিরে?
তর বর উঠে পর রাত ভোর দেখ না?
হাত তুলে প্রাণ খুলে স্রষ্টারে ডাক না..
ঝিক মিক দশ দিক নাই পিক পাপিয়া..
সাদা বক চক চক উড়ে যায় ডাকিয়া..
বিল ঝিল খিল খিল লাল নীল বরণে,
গাছে গাছে ফিঙ্গে নাচে চঞ্জল চরনে।
ভেজা ভেজা তাজা তাজা শেফালির সুবাসে,
শিশুদল কোলাহল করে নানা হরষে।
টিদার জরিপার শ্যাম শাড়ী অঙ্গে
এ্যলো কেশে এলো হেসে শরত এ বঙ্গে..

মেঘনা পাড়ের ছেলে -আহসান হাবীব
আমি মেঘনা পাড়ের ছেলে
আমি মেঘনা নদীর নেয়ে।
মেঘনা নদীর ঢেউয়ের বুকে
তালের নৌকা বেয়ে
আমি বেড়াই হেসে খেলে-
আমি মেঘনা পাড়ের ছেলে।
মেঘনা নদীর নেয়ে আমি মেঘনা পাড়ে বাড়ি
ইচ্ছে হ’লেই এপার থেকে ওপারে দেই পাড়ি।
তালে তালে তালের নৌকা
দু’হাতে যাই বেয়ে
আমি মেঘনা নদীর নেয়ে।
পাহাড় সমান ঢেউয়ের বুকে নৌকো আমার ভাসে
মেঘমুলুকের পাহাড় থেকে ঝড়ের ঝাপটা আসে-
মাথার ওপর মুচকি হাসে
বিজলি নামের মেয়ে
আমি মেঘনা নদীর নেয়ে।
আমার ঢেউয়ের সঙ্গে গলাগলি ঢেউয়ের সঙ্গে খেলা
ঝড়ের সঙ্গে লড়াই ক’রে কাটাই সারাবেলা।
দেশ থেকে যাই দেশান্তরে
মনের নৌকা বেয়ে-
আমি মেঘনা নদীর ছেলে
আমি মেঘনা নদীর নেয়ে।

জোনাকিরা -আহসান হাবীব
তারা- একটি দুটি তিনটি করে এলো
তখন- বৃষ্টি-ভেজা শীতের হাওয়া
বইছে এলোমেলো,
তারা- একটি দু’টি তিনটি করে এলো।
থই থই থই অন্ধকারে
ঝাউয়ের শাখা দোলে
সেই- অন্ধকারে শন শন শন
আওয়াজ শুধু তোলে।
ভয়েতে বুক চেপে
ঝাউয়ের শাখা , পাখির পাখাউঠছে কেঁপে কেঁপে ।
তখন- একটি দু’টি তিনটি করে এসে
এক শো দু শো তিন শো করে
ঝাঁক বেঁধে যায় শেষে
তারা- বললে ও ভাই, ঝাউয়ের শাখা,
বললে, ও ভাই পাখি,
অন্ধকারে ভয় পেয়েছো নাকি ?
যখন- বললে, তখন পাতার ফাঁকে
কী যেন চমকালো।
অবাক অবাক চোখের চাওয়ায়
একটুখানি আলো।
যখন- ছড়িয়ে গেলো ডালপালাতে
সবাই দলে দলে
তখন- ঝাউয়ের শাখায়- পাখির পাখায়
হীরে-মানিক জ্বলে।
যখন- হীরে-মানিক জ্বলে
তখন- থমকে দাঁড়াঁয় শীতের হাওয়া
চমকে গিয়ে বলে-
খুশি খুশি মুখটি নিয়ে
তোমরা এলে কারা?
তোমরা কি ভাই নীল আকাশের তারা ?আলোর পাখি নাম জোনাকি
জাগি রাতের বেলা,
নিজকে জ্বেলে এই আমাদের
ভালোবাসার খেলা।
তারা নইকো- নইকো তারা
নই আকাশের চাঁদ
ছোট বুকে আছে শুধুই
ভালোবাসার সাধ।

অসুখ -আহসান হাবীব
আমি বড় অসুখী। আমার আজন্ম অসুখ। না না
অসুখে আমার জন্ম।
এই সব মোহন বাক্যের জাল ফেলে
পৃথিবীর বালক-স্বভাব কিছু বয়স্ক চতুর জেলে
মানব-সাগরে।
সম্প্রতি উদ্দাম হাতে নৌকো বায়। আমরা বিমূঢ়।
কয়েকটি যুবক এই অসুখ-অসুখ দর্শনের
মিহি তারে গেঁথে নিয়ে কয়েকটি যুবতী
হঠাৎ শৈশবে গেলো ফিরে
এবং উন্মুক্ত মাঠে সভ্যতার কৃত্রিম ঢাকনায়
দুঃসাহস-আগুন জ্বালিয়ে
তারস্বরে কেবল চিৎকার করে :
আমরা বড় অস্থির। কী চাই,
আমাদের কী চাই, কী চাই!
ওরা বলে : সন্ত্রাসতাড়িত আমরা সন্ত্রাসিত পৃথিবীতে তাই
আমরা কেবল ছুটি। বলে আর ঊর্ধ্বশ্বাসেছোটে।
কোথায় ছুটেছে যদি জানতে চাও ওরা অনায়াসে
জবাবে জানায়, নেই ঠিকানা,
অথবা কোনো ঠিকানার বাসনাও নেই।
নৈরাশ্যের হাওয়া থেকে ক্রোধের আগুন জ্বেলে নিয়ে
ওরা বলে : পুড়ুক পুড়ুক
দু’পাশের শ্যামশোভা, পুরনো ঘরের
পুরনো সম্ভার সব পোড়াবো এবং
শূন্যতাকে একমাত্র সত্য বলে রেখে যাবো দুয়ারে সবার।
আর এই উন্মাদ উৎসবে যদি হঠাৎ কখনো
ব্যথিত প্রবীণ কোনও পথচারী প্রশ্ন করে : শূন্যতার বোঝা
কে বয় এমন করে, কোন অর্থে, কী লাভ, কী লাভ!
ওরা বলে : অর্থ নেই। অর্থ নেই এ জীবনে এই শুধু সার
জেনেছি। জেনেছি কোনো লাভ নেই অর্থের সন্ধানে।
লাভ নেই লাভের আশায় কালক্ষেপে
অথবা শূন্যের কড়ি গুণে গুণে লাভ নেই অলিক ছায়ায়।
তার চেয়ে উদ্দাম জোয়ারে
ভেসে যাবো। এবং যেহেতু
ভেসে ভেসে ডুবে যাওয়া একমাত্র সত্য পৃথিবীতে
সত্যের সজ্জিত বৃদ্ধ গাধাটাকে ডুবিয়ে আমরাও
কিছুকাল মত্ত হাতে নৌকা বেয়ে
জোয়ারের জলে ভেসে যাবো।
এবং একদা ডুবে যাবো।

ঘুমের আগে -আহসান হাবীব
জানো মা, পাখিরা বড় বোকা, ওরা কিছুই জানেনা।
যত বলি, কাছে এসো, শোনো শোনো, কিছুতেই মানেনা।
মিছেমিছি কেন ওরা ভয় পায়, ভয়ের কি আছে?
বোঝেনা বোকারা, আমি ভালোবাসি তাই ডাকিকাছে।
দেখোনা, যখন কাল আমাদের আমবাগানের
পুবধারে ওরা সব বসিয়েছে আসর গানের-
আমি গিয়ে চুপ চুপে কিছু দূরে বসেছি যখন,
গান ভুলে বোকাগুলো একসাথে পালালো তখন।
ওরা কি জানেনা, আমি গান বড় ভালোবাসি, তাই
যখনি ওদের দেখি চুপে চুপে কাছে চলে যাই !
আচ্ছা মা, বলো দেখি কি করে কাটাব এই ভয়,
কি পেলে তখন ওরা সবচেয়ে বেশি খুশি হয়?
সাদা কড়ি ওদের কি ভাল লাগে ? আমার যেমন
ছোট লাল ঘুড়ি আছে, মাজা সূতো, ওদের তেমন
আছে না কি ? কিছু নেই ? বেশ কথা, না-ই যদি থাকে
বোকারা নিজেরা এসে বলে যেতে পারে ত আমাকে,
আমি ত দিতেই চাই, বোকারা যে কখনো আসে না।
জানি, ওরা পাখি কি-না, মানুষকে ভালোই বাসে না।
বলোনা মা, কি করলে পাখিরাও খুব ভালোবাসে,
কি করলে পাখিরাও ভালোবেসে খুব কাছে আসে।
……………………….


Pranab Kumar Kundu


রবিবার, ১৮ নভেম্বর, ২০১৮

রূপক রায়-এর কলাম ( দশ )


রূপক রায়-এর কলাম ( দশ )


ফেসবুক থেকে     শেয়ার করেছেন       প্রণব কুমার কুণ্ডু


Rupok Roy


একটা হাতির মুখ মানুষের শরীরে কি বসানো যায় ? কী যুক্তি আছে এটার পেছনে ?
(Necessary Post for - Niloy Dev)

মুসলমানরা হিন্দুদেরকে ধর্ম বিষয়ে নানা প্রশ্ন করে বিব্রত করে, ঠিকঠাক সেই প্রশ্নগুলোর জবাব দিতে না পারলে হিন্দুরা হেয় হয়, এরপর ধর্ম নিয়ে সে হীনম্মন্যতায় ভুগে, যথা সময়ে এর ট্রিটমেন্ট করা না হলে, দিনের পর দিন এভাবে হেয় হতে হতে এক সময় সে হিন্দুধর্ম ত্যাগও করতে পারে। মুসলমানদের করা ঠিক এই ধরণের একটি প্রশ্নের জবাব দিচ্ছি আজকে।

পৌরাণিক কাহিনী মতে, শিব একবার বাধ্য হয়ে সূর্যকে হত্যা করে, তখন সূর্যের পিতা কশ্যপ, শিবকে অভিশাপ দেয়, সে নিজেও একদিন তার নিজ পুত্রকে হত্যা করতে বাধ্য হবে। এরপর, পার্বতী, তার প্রথম পুত্র কার্তিককে, জন্মের পরপরই, ঘটনাচক্রে ছয় কৃতিকার কাছে রেখে আসতে বাধ্য হলে তার মাতৃত্বের শুন্যতা সৃষ্টি হয় এবং সেই শুন্যতা পূরণে, মনের মাধুরী মিশিয়ে কাদামাটি দিয়ে পার্বতী একটি মূর্তি গড়ে এবং সেই মূর্তিতে প্রাণ সঞ্চার ক’রে একটি পুত্রের জন্ম দেয়। পার্বতী এই পুত্রের নাম দেয় বিনায়ক এবং তাকে নির্দেশ দেয় বাড়ির দরজায় পাহারা দিতে, যাতে পার্বতীর সাধনার সময় কেউ বাড়িতে ঢুকে তাকে বিরক্ত না করে; বিনায়ক সেই দায়িত্ব পালন করার সময় শিব সেখানে আসে এবং বাড়িতে ঢুকতে চায়, তখন বিনায়ক, শিবকে বাধা দেয় এবং তার সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করে, বিনায়কের এই রূঢ় আচরণ এবং মাতৃ আদেশ পালনের অহংকারের কারণে, শিব, বিনায়কের মুণ্ডুচ্ছেদ করে তাকে হত্যা করে। এরপরই পার্বতী সেখানে আসে, এবং তার পুত্রকে জীবিত করে না দিলে সংসারকে লণ্ডভণ্ড করে দেবার হুমকি দেয়। শেষ পর্যন্ত ত্রিদেব মিলে বিনায়ককে জীবিত করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং শিব বলে, উত্তর দিকে গমন করে প্রথম যে প্রাণীকে দেখতে পাবে, সব শুনে সে যদি স্বেচ্ছায় তার মাথা দিতে রাজী হয়, সেই মাথা লাগালে বিনায়ক জীবিত হবে। এই প্রাণীর সন্ধানে দেবরাজ ইন্দ্রসহ অন্যান্যরা উত্তরদিকে গমন করে এবং প্রথমেই এক হাতিকে দেখতে পায়, সেই হাতিকে ঘটনা খুলে বলতেই সে রাজী হয়ে যায় এই কারণে যে, সে মহাদেবের একজন ভক্ত এবং পূর্বে কোনো এক সময় মহাদেবের কাছাকাছি থাকার একটা প্রার্থনা সে জানিয়েছিলো, সেই সময় মহাদেব তাকে, ভবিষ্যতে, কোনো এক সময় তার এই প্রার্থনা পূরণ হবে বলে বর দিয়েছিলো, তার কাটা মস্তকের মাধ্যমে তার সেই ইচ্ছা পূরণ হচ্ছে ব’লে, হাতি তার মাথা দিতে রাজী হয়ে যায়, এরপর বিষ্ণু তার সুদর্শন চক্র দ্বারা হাতির মাথা কেটে দেয়, সেই মাথা দেবরাজ ইন্দ্র নিয়ে এসে দিলে শিব তা বিনায়কের দেহের সাথে জুড়ে দেয়; এভাবে বিনায়ক জীবিত হয়ে ওঠে এবং তার নতুন নাম দেওয়া হয় গণেশ।

যা হোক, গনেশের মাথা জোড়া লাগানোর ঘটনাকে মুসলমানরা বলে বা বলবে অজগুবি গল্প, কিন্তু তাহলে ইসলামের ইতিহাসের চাঁদকে দ্বিখণ্ডিত করে জোড়া লাগানোর ঘটনাটা কী ? কোরানের সূরা কমর এর ১ নং আয়াতে স্পষ্ট করে লিখা আছে, "চাঁদ দ্বি-খণ্ডিত হয়েছে", এর মানে হচ্ছে মুহম্মদের আঙ্গুলের ইশারায় চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হয়েছে এবং তার আঙ্গুলের ইশারাতেই চাঁদ আবার জোড়া লেগেছে। এতবড় একটা ঘটনার প্রমান শুধু কোরান ! যে কোরানের পাতায় পাতায় ভুল আর মিথ্যা। ইসলামের বর্ণনা মতে, এটা মাত্র ১৪০০ বছর আগের ঘটনা, অথচ পৃথিবীর আর কেউ সেই ঘটনা দেখলো না ! কোনো দেশ থেকে সেই ঘটনা আর দেখাই গেলো না! এ্রই রকম অলৌকিক ঘটনা যদি মুহম্মদের থাকতো তাহলে তাকে ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য আর তরবারি নিয়ে ঘুরতে হতো না, এই ক্ষমতা দেখেই মুহম্মদের জীবদ্দশাতেই শুধু আরব নয়, সারা পৃথিবীর লোক ইসলাম গ্রহন করে ফেলতো।

এরপর মানুষের দেহ আর হাতির মাথাওয়ালা গনেশকে নিয়ে যদি মুসলমানদের এলার্জি থাকে, তাহলে বোরাক এর ঘটনাটা কী ? যে বোরাকে চড়ে মুহম্মদ সাত আসমান ডিঙ্গিয়ে আল্লার সাথে দেখা করে এসেছিলো ? এই বোরাকের দেহ ছিলো ঘোড়ার মতো আর মাথা ছিলো নারীর। যেই ঘটনাকে স্মরণ করে মুসলমানরা অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে শব-ই-মেরাজ নামে পালন করে থাকে।

মানুষের দেহে হাতির মাথা জোড়া লাগানোর ঘটনাটা চিকিৎসা বিজ্ঞানের সার্জারির একটা প্রতীকী ঘটনা মাত্র। এখন এক মানুষের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ অন্য মানুষের দেহে লাগিয়ে তাকে বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে, এমন কি কোনো কোনো প্রানীর অঙ্গ প্রত্যঙ্গের মাধ্যমেও মানুষকে বাঁচানোর চেষ্টা চলছে, এই বৈজ্ঞানিক সাফল্য হয়তো একদিন এমন স্তরে পৌঁছবে যখন মানুষের কাটা মাথাও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জোড়া লাগিয়ে তাকে বাঁচানো সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে মানুষের কাটা মাথা জোড়া লাগানোর পরিবর্তে উদাহরণ হিসেবে হাতির মাথা কেনো ? হাতির মাথা বলেই গল্পটা এখনো বেঁচে আছে এবং মানুষ তার চর্চা করে যাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য, না হলে গল্পটা এতদিনে হারিয়ে যেতো এবং ভবিষ্যতের সার্জারি বিদ্যা যে কোথায় পৌঁছতে পারে, এ ব্যাপারে মানুষ ধারণা হারিয়ে ফেলতো। মানবদেহে যে প্রাণীর অঙ্গ প্রত্যঙ্গ লাগানোর চেষ্টা চলছে, সেটা জানার জন্য ক্লিক করতে পারেন নিচের এই লিঙ্কে-

http://www.ntvbd.com/tech/17692/

এই ঘটনার অন্য দিকটা হলো, হিন্দুধর্ম প্রকৃতির ধর্ম, তাই প্রকৃতির সকল কিছুকে শ্রদ্ধা করা হিন্দুধর্মের অংশ। গনেশের মাধ্যমে আমরা হাতিকে সেই ধরণের শ্রদ্ধাই করি। এই শ্রদ্ধা থেকেই গনেশের পূজার উৎপত্তি এবং এই পূজার স্বীকৃতি আছে গীতায়। কেননা, পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ, অর্জুনকে যে বিশ্বরূপ দেখিয়েছিলেন তার মধ্যে গনেশ ছিলো।

গনেশ প্রসঙ্গে অন্য কটূক্তি হলো, সেইটাকে তোমরা হিন্দুরা আবার পূজা করো। আবার সেই গনেশের একটা কলা গাছ বউও আছে।

মেরাজের ঘটনাকে কোনো মুসলমান কি অস্বীকার করার ক্ষমতা রাখে ? রাখে না। কারণ, তাহলে তারা আর মুসলমান থাকবে না। মেরাজের ঘটনাকে স্বীকার করা মানেই হলো নারীর মস্তকযুক্ত ঘোড়ার দেহ- বোরাককে স্বীকার করা আর তাকে শ্রদ্ধা বা পূজা করা। মুসলমানরা যখন এই রকম একটা অদ্ভূত জন্তুকে রেসপেক্ট করছে, যা পৃথিবীতে কখনো ছিলো না; তখন হিন্দুদের গনেশ পূজাকে নিয়ে তাদের এত চুলকানি কেনো ?

আবার গনেশের কলা বৌ এর ব্যাপারটা হলো, দুর্গা পূজায় প্রকৃতির সমস্ত গাছের প্রতিনিধি হিসেবে থাকে নবপত্রিকা। এই নব পত্রিকা হলো নয়টি গাছ, এগুলোর মধ্যে কলা গাছ সবচেয়ে বড় হওয়ায়, অন্য গাছ গুলো কলাগাছের সাথে বেঁধে হলুদ শাড়ি পরিয়ে গনেশের পাশে রাখা হয়, যাকে সাধারণ মানুষ কলাগাছের বউ বলে ভুল করে। অনেক হিন্দুই এই সঠিক তথ্য জানে না, সেক্ষেত্রে কোনো মুসলমানের যদি এটা নিয়ে এরকম ভুল ধারণা থাকে এবং তা নিয়ে কটূক্তি করে, তাকে আর দোষ দিয়ে লাভ কী ?

উপরেই বলেছি, গনেশের দেহের সাথে হাতির মাথা লাগানোর ঘটনাটা একটা সার্জারির ঘটনা এবং এই ঘটনা ভবিষ্যতের জন্য নিদর্শন যে চিকিৎসা বিজ্ঞান কোথায় পৌঁছাবে, চিকিৎসা বিজ্ঞান যে, সেখান থেকে খুব বেশি দূরে নেই, সেটা বুঝতে পারবেন নিচের এই লিঙ্কে ক্লিক করলে; কারণ, মানুষের মাথা প্রতিস্থাপনের লক্ষ্য বিজ্ঞানীরা অলরেডি ইঁদুরের মাথা প্রতিস্থাপন করে ফেলেছে। নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে দেখতে পারেন নিউজটি-
http://www.dailymail.co.uk/…/Scientists-complete-head-trans…

এই লিঙ্কের আর্টিকেলটি দেখুন নিচে-
Ahead of a controversial plan to carry out the first human head transplant later this year, scientists have attached the head of a rat onto the body of another.
In the disturbing experiment, researchers in China affixed the heads of smaller, ‘donor’ rats onto the backs of larger recipients, creating two-headed animals that lived an average of just 36 hours.
The team, which involved the Italian neurosurgeon who is set to perform the hotly-debated procedure on a human, managed to complete the transplant without causing blood loss-related brain damage to the donor.
In the disturbing experiment, researchers in China affixed the heads of smaller, ‘donor’ rats onto the backs of larger rats, creating two-headed animals that lived an average of just 36 hours
HOW THEY DID IT
The researchers used three rats for each operation: a smaller rat, to be the donor, and two larger rats, acting as the recipient and the blood supply.
To maintain blood flow to the donor brain, the connected the blood vessels from that rat to veins of the third rat using a silicon tube, which was then passed through a peristaltic pump.
Then, once the head had been transplanted onto the second rat’s body, the researchers used vascular grafts to connect the donor’s thoracic aorta and superior vena cava to the carotid artery and extracorporeal veins of the recipient.
In the study, researchers from Harbin Medical University in China and controversial neurosurgeon Sergio Canavero built upon earlier head-grafting experiments to figure out how to avoid damage to the brain tissue during the operation, as well as long-term immune rejection.
Previously, scientists have attempted the procedure on dogs and monkeys, which helped to test neural preservation when blood flood to the brain had been cut off, they explain in the paper published to CNS Neuroscience & Therapeutics.
But, long-term survival of the specimens was not a priority.
The researchers used three rats for each operation: a smaller rat, to be the donor, and two larger rats, acting as the recipient and the blood supply.
To maintain blood flow to the donor brain, they connected the blood vessels from that rat to veins of the third rat using a silicon tube, which was then passed through a peristaltic pump.

আশা করছি, গনেশ সম্পর্কিত মুসলমানদের সকল কটূক্তির জবাব, আমার বন্ধুদের মুখে তুলে দিতে পেরেছি, তারপরও এ বিষয়ে কারো যদি কোনো প্রশ্ন থাকে, নির্দ্বিধায় কমেন্টে বা ইনবক্সে বলবেন, ঈশ্বর আমাকে তার সমাধান দেবার সময় ও জ্ঞান প্রদান করবেন বলে আশা রাখি।

জয় হিন্দ।
জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীকৃষ্ণ।

From: Krishna kumar das
💜 জয় হোক সনাতন ধর্মের

Pranab Kumar Kundu



কুশণ্ডিকা


কুশণ্ডিকা



কুশণ্ডিকা।
বিবাহের পর অনুষ্ঠেয়, মাঙ্গলিক যজ্ঞবিশেষ।

বিবাহকালের, ধর্মকার্যবিশেষ !

ওটি, এক দিকে, মাঙ্গলিক যজ্ঞ, অন্য দিকে, সর্বহোমার্থক অগ্নিসংস্কার !

এতে, আগে নির্দিষ্ট 'ঋক্' গান গাইতে হত !
অন্তত, তিনবার, সেই 'ঋক্', নিদেনপক্ষে,  আবৃত্তি করতে হত।

এখন সেই 'ঋক্' গান গাওয়ার প্রথা, প্রায় উঠেই গেছে।

পরে দেখা যাবে, সেই গান গাওয়ার জন্য, কোন গাইয়ে দলকে, হয়তো দেয়া হবে 'ঠিকা'।

শনিবার, ১৭ নভেম্বর, ২০১৮

অবাস্তব ইসলাম এবং মুসলমানদের প্রকৃত চরিত্র


অবাস্তব ইসলাম এবং মুসলমানদের প্রকৃত চরিত্র:


ফেসবুক থেকে      শেয়ার করেছেন        প্রণব কুমার কুণ্ডু


Rupok Roy


অবাস্তব ইসলাম এবং মুসলমানদের প্রকৃত চরিত্র:
লেখক - মুফতি আব্দুল্লাহ আল মাসুদ

( অনেক মুসলমান, হিন্দুদেরকে মুসলমান বানাতে মরিয়া, এদেরকে বলছি, জন্মসূত্রে মুসলমান এই মাসুদকে আগে থামান বা তার কথার জবাব দেন, তারপর হিন্দুদেরকে মুসলমান বানাইতে আইসেন।)

অামার বয়স তখন নয়, এর অাগে স্কুলে পড়েছি। স্কুলের সামনে থেকে বিকেলবেলা দলবেঁধে মাদরাসার ছাত্ররা হেঁটে কলেজমাঠে খেলতে যেত, তাদের সুশৃঙ্খল ও সারিবদ্ধভাবে হাঁটায় অামি মুগ্ধ হয়ে অাব্বাকে বললাম, “অামি মাদরাসায় পড়বো।”

অাব্বা অামাকে প্রতিদিন মাদরাসায় অানা-নেয়া করতেন।

মাদরাসা গমনের ক’দিন পরের ঘটনা- সকালে ফজরের পরপর দেখি বিরাট এক বিচারের অায়োজন, চারজন বড়ভাইকে পিঠমোড়া করে বাঁধা হয়েছে। গাজীপুরী হুজুর ও অন্যান্য হুজুররা মিলে চারজনকে ভয়াবহ রকম পেটালেন।

অামি একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, এরা মার খাচ্ছে কেন? বলা হলো, ওরা রাতে অন্যের মশারিতে গিয়েছে। নয় বছরের মন বোঝেনি, বিছানায় যাওয়া অপরাধ কিনা। ভয় পেয়ে গেলাম এত মার দেখে, অাব্বাকে বললাম, অাব্বা, অন্যের মশারিতে ঢুকলে কি হয়? এবং এজন্য হুজুররা পেটায় কেন? অাব্বা কি জবাব দিয়েছিলেন মনে নেই।

অাব্বা ছিলেন নবীপুর মসজিদের ইমাম।

বারো বছর বয়সে হাফেজ হলাম। কোরঅান অামার মাতৃভাষায় লেখা নয়, কিন্তু কোরঅানকে খুব ভালোবাসতাম। কোরঅান অাল্লাহর বাণী, প্রতিটি হরফে দশ নেকি। কোরঅানে কোন প্রাণীর ছবি নেই, কোরঅানে কোন প্রকৃতির ছবি নেই।

নয় বছরের শিশুমন ছবিওয়ালা বই দেখলে পড়তে চাইত, গল্পের বই দেখলে পড়তে চাইত, কবিতা দেখলে পড়তে চাইত। হুজুররা বলতেন, ছবি অাঁকা, ছবি তোলা, ছবি দেখা, নাটক দেখা, গান শোনা, বাঁশি বাজানো, প্যান্টশার্ট পরা হারাম। হারাম জানতাম, তবুও বারবার অাকর্ষিত হত স্কুলের পাঠ্যবইয়ের ছবিগুলোয় মন, গান শোনার জন্য উতলা হয়ে যেত প্রাণ।

লুকিয়ে লুকিয়ে করকরানির বাসায় গিয়ে নাটক দেখতাম, রাতে মাদরাসার বিছানায় কোলবালিশ কাঁথা দিয়ে ঢেকে মনুষ্যরূপ বানিয়ে রাসেলদের বাসায় গিয়ে হিন্দি ও বাংলা ছবি দেখতাম অামরা ক’জন। সীমাদের বাসায় গিয়ে শুক্রবার বিটিভিতে বাংলা সিনেমা দেখতাম। একপর্যায়ে সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখতে থাকলাম। অাব্বা ধরে ফেললেন, হুজুররা জেনে গেলেন, শুরু হলো শাস্তি। এ শাস্তি দোষের নয়, অাল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য শয়তান খেদানোর জন্য মার খেলে সোয়াব হয়, মার খাওয়া অঙ্গ দোজখে জ্বলে না।

অাব্বা অামাকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন। মনে পড়ে- প্রায়ই তিনি পকেটে করে অাস্ত কিংবা কাটা ফল নিয়ে অাসতেন, অামি জানতাম সেটা দাওয়াত খেয়ে পকেটে করে নিয়ে অাসা ফল। ভালো দাওয়াত থাকলে মাদরাসা থেকে ছুটি নিয়ে দাওয়াতে নিয়ে যেতেন। অামার শিক্ষক হাফেজ অাবুল কাসেম অাব্বার মসজিদে তারাবি পড়াতেন, তাই খুব সুসম্পর্ক ছিল দুজনের মাঝে। হিফজখানায় অামি সবক (পড়া) দিতাম পাঁচ/ছয় পৃষ্ঠা করে, সবাই অবাক হত তা দেখে, দুই/তিনঘন্টায় পাঁচ-ছয় পৃষ্ঠা মুখস্ত করা সাধারণ বিষয় নয়।

হুজুর চাপ দিতে লাগলেন- এতে চলবে না, দশপৃষ্ঠা সবক দিতে হবে, সাথে পিটুনির ভয়। কী অার করা, একদিন জেদ করে ১১ পৃষ্ঠা সবক দিয়ে ফেললাম! হুজুর অাব্বাকে খবর দিলেন, অাব্বা তো মিষ্টিসমেত হাজির। হাফেজী শেষ হলো, কিতাবখানায় ভর্তি হলাম, মাওলানা হতে হবে।

কিন্তু বাংলা বইয়ের প্রতি দুর্নিবার অাকর্ষণ থামলো না, কবিতা-গল্প-উপন্যাসের প্রতি দুর্দমনীয় টান কমলো না।

বড়বোনের স্কুলবইগুলি পড়ে সাবাড় করতাম,

প্রতিবেশীর স্কুলবইগুলি পড়ে সাবাড় করতাম,

ফেরিওয়ালার কাছ থেকে কবিতা-গল্পের বই কিনে গোগ্রাসে গিলতাম।

উপন্যাস পড়া হারাম, হিন্দু রবীন্দ্রনাথের বই পড়া হারাম, বেনামাজির লেখা বই পড়া হারাম, নজরুলের দাড়ি ছিল না বলে তাঁর বইও পড়া হারাম! ফতোয়া শুনতাম।

কিন্তু কিছুতেই ছাড়তে পারছিলাম না ‘হারামের নেশা।’

সুযোগ পেলেই দে ছুট সিনেমা হলে, রাসেলদের বাসায়। সুযোগ পেলেই দৌড়াতাম ভিডিও গেম-এর দোকানে। মাদরাসায় নিয়ে যেতাম নজরুল-রবীন্দ্রনাথের হারাম বই, লুকিয়ে লুকিয়ে পড়তাম। রাতের বেলা না ঘুমিয়ে মাদরাসার গোসলখানার অালোয় গিয়ে নজরুল রবীন্দ্র পড়তাম। এতে ডিস্টার্ব হতো নিশি দরবেশ ভাইদের। নিশি দরবেশ ভাইয়েরা প্রতিরাতে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে অন্যের বিছানায় যেত, শরীর ঠান্ডা করতে। সারাদিন জোব্বা, তসবিহ, পাগড়ি নিয়ে জিকির-অাজকার ও দোয়া-দুরূদ পাঠ করতো।

নিশি দরবেশরা অামার নামে অভিযোগ দাখিল করলো, সে রবীন্দ্রনাথের বই পড়ে। হুজুররা অামার ট্রাংক ঘেঁটে রবীন্দ্র, নজরুল, সমরেশ, হুমায়ুন উদ্ধার করলেন, সাথে বেতের বাড়ি।

অামার ঘুম ছিল খুব গাঢ়, সহজে ভাঙতো না। ফজরের নামাজের পূর্বে অামাদেরকে ঘুম থেকে জাগাতে লাঠিচার্জ করতেন হুজুররা, দশ পনেরোটা বেতের বাড়ি খাওয়ার পর অামার ঘুম ভাঙত!

হুজুররা দয়ালু ছিলেন, প্রথমে অাস্তে পেটাতেন এরপর ক্রমেই জোরে।
একদিন তো মাওলানা মাসুদ হুজুরের (অামার নামের মিতা) খাটের নিচেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম!

অারেকদিনি সবার বেডিংয়ের তলায় ঘুমিয়েছিলাম, ঘামে পুরো জবজবে অবস্থা!

ক্লাসমেটরা অামার মাথাকে বলত কম্পিউটার, সারাদিন ঘুমিয়েও প্রত্যেক পরীক্ষায় ফার্স্ট হতাম।

অাব্বার অাশা ছিল- তাঁর ছেলে জগদ্বিখ্যাত অালেম হবে। অাব্বা খুব পছন্দ করতেন ইমাম গাজ্জালি ও অাশরাফ অালি থানভীর বই। তিনি অাশা করতেন, তাঁর ছেলে যুগের গাজ্জালি হবে।

একদিন কলেজমাঠে গিয়ে শুনি একটি গাড়িতে বাজছে- “ওরে নিল দরিয়া…

” অামি মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনলাম। অামার ক্লাসমেট ও বন্ধুরা গান শুনতো, হুজুররা লুকিয়ে গান শুনতেন, কিন্তু ছাত্ররা গান শুনলে পেটাতেন!

অামি যখন কিতাবখানার দ্বিতীয় বর্ষে পড়ি তখন হিফজখানার প্রধান শিক্ষক ছিলেন চট্টগ্রামের একজন মুজাহিদ হুজুর, তিনি সারাক্ষণ জেহাদি চেতনা প্রচার করতেন। লম্বা দাড়ি, পাগড়ি, জোব্বা সবসময় পরিধান করতেন। প্রত্যেক রাতে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়তেন।

তৃতীয় বর্ষের এক বড়ভাই হঠাৎ বোমা ফাটালেন- জেহাদি হুজুর নাকি তাহাজ্জুদ শেষে ছাত্রদের সাথে অাকাম করেন। বড়ভাইদের নেতৃত্বে তদন্ত হলো, হিফজখানার সুন্দর চেহারার ছাত্রদেরকে জেরা করে থলের বেড়াল টেনে অানা হলো।

বয়সে ছোট হওয়ার কারণে ফার্স্টবয় হওয়া সত্ত্বেও তদন্ত কমিশনে অামি অানফিট। কিন্তু খবর জানতাম। কমপক্ষে দশজন ছাত্রের কাছ থেকে সাক্ষ্য সংগ্রহ করা হলো। ছোট্ট এক ছাত্রের সাক্ষ্যদান ছিল বেশ চমকপ্রদ: তার ভাষ্য, হুজুর অামারে রাইতে ডাইক্কা নিয়া গেল। অামি রাজি না অইলে হুজুর অামারে অাল্লার গজবের ভয় দেহাইলো। কইলো, তুই কাম করতে না দিলে কালকে অাল্লার গজবে ধ্বংস অইয়া যাবি। তহন ভয়ে রাজি অইলাম। হুজুরের সোনা অামার … দিয়া ঢুকাইলো। অামি ব্যতায় কাইন্দা ফালাইলে হুজুর কইলো, কানলেও অাল্লার গজব পড়বো! কাম শ্যাষ অইলে হুজুরের … থিক্কা কষ বাইর অইলো।

মাদরাসায় তীব্র অান্দোলন হলো জেহাদি হুজুরের বিরুদ্ধে, সব ছাত্রকে ডেকে মুহতামিম (প্রিন্সিপাল) সাহেব বললেন- এই কথাগুলি বাইরে বললে ইসলামের ক্ষতি হবে, কমিটিকেও বলা যাবে না, ইসলামের ক্ষতি হবে।

জেহাদি হুজুরের পক্ষে মুহতামিম সাহেব, সবাই গজারির লাঠি যোগাড় করলাম। অামি অামার ক্লাসে বয়সে সবার ছোট হয়েও গজারির লাঠি হাতে পেলাম। অবশেষে রাতের অাঁধারে জেহাদিকে মাদরাসা থেকে বের করে দেয়া হলো।

অাবার টান, অাবার কবিতা, অাবার উপন্যাস ফিরে এলো জীবনে। হাতে এলেন জীবনানন্দ, যতই পড়ি ততই মুগ্ধ হই।

“অাবার অাসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে এই বাংলায়” পড়ার পর কেঁদে ফেলেছিলাম, এত সুন্দর হয় পৃথিবী! এত সুন্দর হয় বাংলা ভাষা!

মাদরাসার বন্দি জীবনেও যেন দেখছিলাম প্রকৃতিকে অাপন শোভায়। অার মাদরাসায় যে বন্দিজীবন যাপন করছি অামরা সবাই তা তো শুধুই অাল্লাহর রেজামন্দি লাভের অাশায়।

দুনিয়ার সুখ অাসল সুখ নয়। দুনিয়ার পাখি, নদী, পাহাড়, সাগর, ফুল, ফল কিছুই অাসল নয়। অাখেরাতের নদী, অাখেরাতের পাখি, অাখেরাতের ফুল হলো অাসল ফুল।

ততদিনে মনের রাজ্যে সর্বনাশ করে ফেলেছে জীবনানন্দ; জোনাকির ঝিকিমিকি, ঝিঁঝিপোকার ডাক, চাঁদের জ্যোৎস্না, তটিনীর কুলকুল রব, শটিবনের নান্দনিকতা, বাবুইয়ের সৃষ্টিশীলতা অামাকে নেশাগ্রস্ত করে ফেলেছে। জীবনানন্দ প্রকৃতিকে ভালবাসতে শিখিয়েছে।

না, না, এসব শয়তানের ওয়াসওয়াসা! শয়তান দুনিয়ার সৌন্দর্যে ভুলিয়ে অামাকে অাখেরাত বিমুখ করতে চায়। শয়তান হিন্দুদের কবিতা দিয়ে অামার ঈমান নষ্ট করতে চায়।

হিন্দুদের বই বয়কট করলাম, মুসলমানদের বই পড়তে লেগে গেলাম।
হুমায়ুন অাজাদ নামের অচেনা এক মুসলমান লেখকের প্রবন্ধ পড়লাম ‘অন্যদিন’-এ, “কবিতায় অামার প্রথম অনুভূতি” পড়ে অাবারও থ হয়ে গেলাম। কবিতা তাহলে এত ভাল! বাংলা ভাষা তাহলে এত মধুর !

কিন্তু হুজুররা যে বলেন, বাংলা হিন্দুদের ভাষা, অারবির চেয়ে বাংলাকে বেশি ভালবাসলে ঈমান নষ্ট হবে!

না, বাংলা পড়া যাবে না, অারবি পড়তে হবে, উর্দু পড়তে হবে।

মুসলমান হুমায়ুন অাজাদ এত সুন্দর লিখেছে, তাই তাঁর নামটা মুখস্ত মনে রেখেছি।

চারিদিকে শোরগোল, মিছিল, অান্দোলন। তসলিমা নাসরিনের ফাঁসি চাই। হুজুররা অামাদের বোঝালেন, ইহুদীদের টাকা খেয়ে তসলিমা মুসলমানদের ঈমান নষ্ট করার মিশনে নেমেছে। তসলিমা শুধু ‘খারাপ কাম’ করে।

শয়তান বসে নেই, অামাকে দাগা দিতে লাগলো- পড়েই দেখ, কি লিখেছে তসলিমা!

তাহাজ্জুদের নামাজ বাড়ালাম, জিকির-অাজকার বাড়ালাম, হুজুরের সাথে মোশাওয়ারা (কাউন্সেলিং) বাড়ালাম। হুজুর পরামর্শ দিতে লাগলেন, দোয়া ও অামল বাতলে দিলেন।

সব দোয়া ব্যর্থ করে দিল বিতাড়িত শয়তান। তসলিমার বই কিনলাম, মাদরাসায় রেখে গোপনে পড়লাম। যতই পড়ি ততই ‘অাস্তাগফিরুল্লাহ, নাউজুবিল্লাহ’ পড়ি, তবুও পড়তে ভাল লাগে, ভাষা ভাল লাগে।

একদিন নিশি দরবেশদের কারণে ফাঁস হয়ে গেল- তসলিমার বই অাছে মাসুদের কাছে। সারা মাদরাসা তোলপাড়, প্রচণ্ড পিটিয়ে বহিষ্কার করা হবে মাসুদকে, সিদ্ধান্ত পাকা। উত্তরা বাইতুসসালাম মাদরাসা। একজন শিক্ষক অামার পক্ষে কথা বললেন। ছেলেটা মেধাবি, সহজ সরল, ওকে এবারের মত ক্ষমা করা হোক। হুজুরদের পায়ে ধরে তওবা করলাম, ইহুদীর দালালদের বই পড়বো না।

অাল্লাহর কাছেও বেশ কিছুদিন কান্নাকাটি করলাম, শয়তান খান্নাছদের বই পড়েছি, অাল্লাহ ও রাসুলের দুশমনদের বই পড়েছি।

একদিন পত্রিকা পড়তে গিয়ে মহাত্মা গান্ধীর জীবনের কিছু অংশ পাঠ করলাম।

মহাত্মা গান্ধী হিন্দু, হিন্দু কখনোই ভাল হতে পারে না। হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, ইহুদী সবাই ‘ফি নারি জাহান্নামা খালিদীনা ফিহা।’

ছবিযুক্ত বাংলা বইয়ে তীব্র অাকর্ষণ, কবিতায় তীব্র অাকর্ষণ, মায়ের ভাষায় তীব্র অাকর্ষণ।

হুজুরের পরামর্শ নিলাম। হুজুর বললেন, “তুমি ইসলামি লেখকদের সাহিত্য পড়।”

হাতে এলো অাবুল অাসাদ, কাসেম বিন অাবুবকর, নসীম হিজাযীর বই।
অাবুল অাসাদের জিহাদি গল্পের চেয়ে মাসুদ রানা ভাল লাগল।

মাসুদ রানা শুরু হলো, সাথে গভীর অনুশোচনা ও তওবা। তসলিমা ফিরে এলো, সাথে অাবার তওবা।

ভাবতে লাগলাম, অামার ক্লাসমেটরা রাতে তাহাজ্জুদ পড়ে, এরপর অন্যের মশারিতে ঢোকে। সারাদিন তসবিহ জপে, সুযোগ পেলেই জুনিয়র ছাত্রদের সাথে চুমোচুমি করে। পুরুষ হয়ে অারেক ছেলেকে কিভাবে চুমোয় বুঝিনি, পুরুষ কিভাবে পুরুষের পায়ুপথে মুজামা’অাত (সহবাস, অারবি শব্দ) করে বুঝিনি।

অামিও ভাবা শুরু করলাম, তারা ‘অাকাম’ করে তওবা করে অাল্লাহর কাছে মাফ চায়, অামিও কাফের-মুরতাদের বই পড়ে অাল্লাহর কাছে মাফ চাইব।

বড়ভাই কামাল খুবই অামলদার ছিল। অামি জোরে হাসলে নিষেধ করতো, অাল্লাহর রাসুল জোরে হাসতে নিষেধ করেছেন, মুচকি হাসতে বলেছেন। কামাল ভাই খুবই অামলদার ছিল, প্রায় দিনই তাহাজ্জুদ শেষে “মুজামাঅাত” না হলে তার চলত না!

কাফেররা সারাদিন হাইওয়ানের (জন্তু) মত অাকামকুকাম করে, মুসলমান সামান্য কিছু করলেই দোষ!

পড়ানো হল ‘কুদুরি, হেদায়া, নূরুল অানওয়ার, উসুলুশ শাশী’ কিতাব সমূহ। জেহাদ, গনিমতের মাল বণ্টন, তালাক, নিকাহ, সংসার, সহবাস এর মাসঅালা পড়লাম। শয়তান ধোঁকা দিতে শুরু করলো- তোমার নবীর চেয়ে মহাত্মা গান্ধী ভালো, তোমার নবীর চেয়ে জীবনানন্দ ভাল, তোমার নবীর চেয়ে নজরুল ভাল।

নজরুল যদি ভালই হয় তাহলে নজরুল কেন নবীকে এত ভক্তি করেছে? গান্ধী যদি মহান হয় তাহলে গান্ধীর চেয়ে নবীজির অনুসারী এত বেশি কেন?

অাবারও শয়তান সাময়িক পরাজিত হলো।

অারবি সাহিত্য খুব পছন্দ করতাম, এখন দেখছি বাংলা সাহিত্যও ভাল লাগছে!

ইংরেজিও ভাল লাগছে। মাদরাসায় ইংরেজির কিচ্ছু শেখায়নি, কিন্তু দেখছি অামি ইংরেজি খুব সহজে বুঝি। ইংরেজি শিখতে লাগলাম উইদাউট হেল্প অব টিচার।

অামি অনেক কবিতা পারতাম বলে শরীয়তপুরী হুজুর (সাহিত্যিক হিসেবে সুনাম অাছে) অামাকে খুব স্নেহ করতেন। অন্যরা অবশ্য অামাকে ‘বিতর্কিত’ মনে করতেন।

এলো তালেবান অান্দোলন, চতুর্দিকে তালেবানের প্রশংসা, অাফগানিস্তানের শান্তি ও সাম্যের প্রশংসা শুনতাম হুজুরদের কাছে। হাতে পেলাম মাসিক ‘জাগো মুজাহিদ।’ জেহাদি চেতনা জেগে উঠল। বাংলাদেশকে ইসলামিক দেশ বানাতেই হবে, একমাত্র জেহাদের মাধ্যমেই কায়েম হবে ইসলাম।

ততদিনে একটু বড় হলাম, দাড়িমোচ গজালো।

“অামরা হব তালেবান, বাংলা হবে অাফগান” স্লোগানে মুখর করলাম পল্টন ময়দান।

অাবারো শয়তান, অাবারো ওয়াসওয়াসা।

জেহাদ কি মানবতার সমাধান? রক্তপাতে কি শান্তি?

শয়তান নিয়ে এলো মহাত্মা গান্ধীকে, “চোখের বদলে চোখ পৃথিবীকে অন্ধ করে দেবে।”

– ঈমানে ওয়াসওয়াসা হানা দিল।

অাবারো প্রবোধ-

মহাত্মা যত ভালই হোক, সে হিন্দু। হিন্দুরা ‘ফি নারি জাহান্নামা খালিদীনা ফিহা।’
অাবার তওবা, অাবার ইস্তিগফার…

– প্রিয়নবী, পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ অাপনাকে ভালবাসে। অামিও তাদের একজন ছিলাম। অাপনার মোটিভেশনাল পাওয়ার সত্যিই অসাধারণ! একটি বিশৃঙ্খল জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার কৃতিত্বও অাপনার।

অাপনাকে নিয়ে কত স্তুতিকাব্য রচিত হয়েছে, কত সঙ্গীত গাওয়া হয়েছে, কত মানুষ জীবন দিয়েছে অাপনার ভালবাসায়!

অাপনি কি সমর্থন করেন অাপনার উম্মতের বর্তমান কর্ম?
অাপনি নিজেও যা করেছেন তা কি অাপনি এখনও সমর্থন করছেন?

অামি কাফেরদের বই পড়ে তওবা করতাম। অাপনি দৈনিক একশোবার তওবা করতেন।

অাপনিও কি লুকিয়ে লুকিয়ে কাফেরদের বই পড়তেন?

লেখক: আব্দুল্লাহ আল মাসুদ। ১০ বছর টানা মসজিদে ইমামতি করেছেন মুফতি মাসুদ, দীর্ঘদিন একটি কওমী মাদ্রাসার প্রিন্সিপ্যালের দায়িত্ব পালন করেছেন।

From: Krishna kumar das
💜 জয় হোক সনাতনের 💜

Pranab Kumar Kundu