শনিবার, ৬ জানুয়ারি, ২০১৮

সোমনাথ মন্দির, নেহরু, ও রাজেন্দ্রপ্রসাদ


সোমনাথ মন্দির, নেহরু, ও রাজেন্দ্রপ্রসাদ






Shared by                     Pranab Kumar Kundu.


Ramprasad Goswami

গুজরাটের সোমনাথ মন্দিরে’র কারণে ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি প্রয়াত ডঃ রাজেন্দ্রপ্রসাদের কি হাল হয়েছিল, -- আজ আপনাদের সে বিষয়ে কিছু জানানো অবশ্যই দরকার। সত্যি কথা বলতে কি, ডঃ প্রসাদ’কে এর জন্যে বিরাট মূল্য চোকাতে হয়।

জওহরলাল যে সোমনাথ মন্দিরের বিপক্ষে ছিলেন, -- কথাটা কমবেশি সকলেই প্রায় জানাই ছিল। অতএব সর্দার প্যাটেল গান্ধী’জীর শরণাপন্ন হলেন। কোনমতে সেখান থেকে সম্মতি আদায় করেই তিনি হাত লাগালেন মন্দিরের পুনঃনির্মাণে। কিন্তু দুর্ভাগ্য! কাজ শেষ হবার আগেই মৃত্যু হল তাঁর।

সর্দার’জীর মৃত্যুর পর, তাঁর এই অসমাপ্ত কাজের ভার গিয়ে পড়ে, শ্রদ্ধেয় শ্রী কে এম মুন্সী’র উপর, অন্যদিকে যিনি আবার ছিলেন নেহেরুর ক্যাবিনেট মন্ত্রীও । ইতিমধ্যে মৃত্যু হয়েছে গান্ধী’জীর-ও।

গান্ধী-প্যাটেলের মৃত্যুর পর এই ইস্যু’তে নেহেরুর বল্গাহীন বিরোধী সুর ক্রমশঃই তীব্রতর হতে শুরু করে। চড়তে থাকে তিক্ততার পারদ। তেমনই একটি মিটিং-এ তো একবার মুন্সী’কে কড়া ধমক’ই দিয়ে বসেন নেহেরু! তাঁর বিরুদ্ধে ‘হিন্দু-পুনরুত্থানবাদ’ তথা ‘হিন্দুত্ববাদ’ প্রচারের তকমা লাগিয়ে তীব্র ভর্ৎসনাও করেন তিনি। কিন্তু মুন্সী’জীও তাঁর সিদ্ধান্তে অটল। তাঁর চাঁছা-ছোলা বক্তব্য – সর্দার প্যাটেলের অসমাপ্ত কাজ তিনি সমাধা করবেন-ই করবেন! তাছাড়া মুন্সী ছিলেন নিজেও একজন গুজরাটি, অতএব,  তাঁর পক্ষে এই বিষয়টিও মন্দির নির্মাণে গতি আনতে সহায়তা করে।

অতঃপর মন্দির নির্মান সমাপ্ত হলে, তিনি স্বাধীন ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি ডঃ রাজেন্দ্রপ্রসাদ’কে শুভ-দ্বারোদঘাটনের জন্য সসম্মানে আমন্ত্রণ জানান। রাজেন্দ্রপ্রসাদও অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে উক্ত ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী থাকতে স্বীকৃত হন। কিন্তু এই খবরে বেঁকে বসেন নেহেরু। জল এতদূর গড়ায় যে, স্বয়ং নেহেরু চিঠি লিখে ডঃ প্রসাদ’কে সোমনাথ মন্দিরের উক্ত অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে নিষেধ করে দেন। কিন্তু এবারে রুখে দাঁড়ালেন রাজেন্দ্রপ্রসাদ। নেহেরুর রক্তচক্ষু’কে আমল না দিয়ে তিনি উপস্থিত হলেন সোমনাথ মন্দিরে। শুধু উপস্থিত হওয়াই নয়, সেখানে উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে দিলেন এক জবরদস্ত ভাষণ।

মারাত্মক ঝটকা খেলেন নেহেরু। তাঁর আঁতে লাগল ঘা! এটিকে তিনি নিজের নৈতিক পরাজয় বলে হজম করতে বাধ্য হলেন। কিন্তু বিনিময়ে রাজেন্দ্রপ্রসাদ’কেও বড়ো গুনাগার গুনতে হল, কারণ এরপর থেকে নেহেরু তাঁর সঙ্গে যে ধরণের নজিরবিহীন অভব্য আচরণ শুরু করেন, তা ভাবলে আজও বিস্ময়ে হতবাক হতে হয়!

সোমনাথ মন্দিরের তরজা’কে কেন্দ্র করে রাজেন্দ্রপ্রসাদ ও নেহেরুর ব্যক্তিগত সম্পর্কে এতটাই তিক্ততার সৃষ্টি হয় যে, রাষ্ট্রপতি পদ থেকে অবসর গ্রহণের পর তাঁকে দিল্লীতে থাকার মত একটি ঘর পর্যন্ত বরাদ্দ করতে অস্বীকার করেন নেহেরু। অথচ রাজেন্দ্রবাবু লেখালেখি পছন্দ করতেন, তার বড় শখ ছিল, বৃদ্ধ বয়সে জীবনের শেষ দিনগুলি তিনি দিল্লীর বুকেই বই-টই লিখে কাটান। নেহেরুর মত মানুষের কি এমন’টা করা উচিৎ ছিল? একজন ভূতপূর্ব রাষ্ট্রপতি’র যা যা সম্মান বা অধিকার পাবার কথা ছিল, তা’র সব কিছু থেকেই ওই ভদ্রলোকটিকে বঞ্চিত করা হয়। অগত্যা নিরুপায় প্রসাদজী’ তাঁর আদি নিবাস পাটনায় ফিরে আসতে বাধ্য হন। কিন্তু সেখানেও তাঁর নিজস্ব কোন সংস্থান ছিল না। না ছিল টাকা-কড়ি, না কোন বাড়ি-ঘর। আর অন্যদিকে পাটনা’তে যথেষ্ট সংখ্যক সরকারী বাংলো বা আবাসন থাকা সত্ত্বেও নেহেরুর নিষ্ঠুরতায় সে সব জায়গায় তাঁর থাকা খাওয়ার নুন্যতম সুযোগ-ও তিনি হারালেন।

শেষমেশ পাটনার সদাকৎ আশ্রমের একটি আলো-বাতাসহীন বদ্ধ কুঠুরিতে ডঃ রাজেন্দ্রপ্রসাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই মেলে। না, তাঁকে দেখভাল করার মতও কেউ ছিল না; ছিল না কোন ডাক্তার!

ধীরে ধীরে শরীর ভেঙ্গে পড়তে লাগল, ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতির। আবদ্ধ ঘরে থাকতে থাকতে ক্রমশঃ দেখা দিল শ্বাসকষ্ট। সারা দিন ধরে দমকে দমকে কাশির সঙ্গে উঠতে লাগল কফ। কিন্তু হায়! তিনি ছিলেন অসহায়!! দেশের একজন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি হওয়ার সুবাদে দ্বারে দ্বারে সাহায্যের জন্য ভিক্ষা করাও যে তাঁর পক্ষে ছিল অসম্ভব। অন্যদিকে, রাজেন্দ্রপ্রসাদের পাটনা আসার পর থেকে তিনি কেমন আছেন, বা তাঁর কি ভাবে চলছে? – ইতিহাস সাক্ষী, চক্ষুলজ্জার খাতিরে নেহেরু একবারও সে খবর নেবার প্রয়োজন বোধ করে দেখলেন না।

শুধু নেহেরুই নন, সেদিন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি’র অসুস্থতার খবর পাবার পরও এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি, যিনি... নূন্যতম চিকিৎসার সুবিধাও তাঁর কাছে পৌঁছে দেবার চেষ্টা করেছিলেন!

বিহারে তখন কংগ্রেসেরই রাজত্ব, সুতরাং বলাইবাহুল্য কোন এক অদৃশ্য অঙ্গুলিহেলনে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ডঃ রাজেন্দ্রবাবু সুচিকিৎসা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা থেকে চিরবঞ্চিত রইলেন। পাশাপাশি ইতিহাস সাক্ষী হয়ে রইল তাঁর প্রতি নানা নির্দয় অমানবিক আচরণের। কার নির্দেশে এসব ঘটেছিল সেদিন?

ডঃ প্রসাদের কফ-কাশির সমস্যা ছিল। তাই প্রায়ই পাটনার মেডিক্যেল কলেজে তিনি চিকিৎসা করাতে যেতেন। সেখানে, আর দশজন সাধারণ রোগীর মতোই তাঁর চিকিৎসা হত। কিন্তু শুনলে অবাক হবেন,... সেখানে যে মেশিনটি’তে তাঁর চিকিৎসা হত, সেটিকেও পর্যন্ত দিল্লী পাঠিয়ে দেওয়া হয় বলে জানা যায়। অর্থাৎ রাজেন্দ্রবাবুকে প্রকারান্তরে তিলে তিলে মারার সব ব্যবস্থা পাকাপোক্ত ভাবেই সম্পন্ন করা হয়েছিল।

একবার শ্রী জয়প্রকাশ নারায়ণ তাঁর সঙ্গে দেখা করতে সদাকৎ আশ্রমে গিয়ে পৌঁছান। উদ্দেশ্য, দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি তথা সংবিধান সভার অধ্যক্ষ কেমন আছেন তা স্বচক্ষে পরিদর্শন করা। কিন্তু হায়! এ কি দেখছেন নারায়ণ? রাজেন্দ্রপ্রসাদের অবস্থা দেখে তিনি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান! তাঁর চোখের পাতা ভারি হয়ে আসে। তাঁর ভাবনাতেই আসে না, কি বলবেন তিনি? আর একমূহুর্তও অপেক্ষা না করে তিনি তাঁর অফিসারদের নির্দেশ দেন, প্রসাদজী’র কামরাখানিকে যাতে অবিলম্বে বাসযোগ্য করে গড়ে তোলা হয়। সেই মত কাজও হয় তুরন্ত। কিন্তু রাজেন্দ্রবাবু আর বেশি দিন বাঁচেন নি। সেই ঘরেই ১৯৬৩’র ২৮শে ফেব্রুয়ারী তাঁর দেহান্ত হয়।

ডঃ রাজেন্দ্রপ্রসাদের মৃত্যুর পরেও নেহেরুর ক্ষোভ প্রশমিত হয় নি। শান্ত হতে পারেননি তিনি। তাই প্রসাদজী’র অন্ত্যেষ্টি’তে পর্যন্ত যোগ দিতে নেহেরু অনিচ্ছা প্রকাশ করেন। আর সম্ভবত সেই কারণেই, রাজেন্দ্রপ্রসাদের শেষ যাত্রার দিন তিনি পাটনা থেকে বহু দূরে রাজস্থানে’র জয়পুরে চলে যান। শুধু কি তাই? রাজস্থানের তৎকালীন রাজ্যপাল, ডঃ সম্পূর্ণানন্দ’জী এই উপলক্ষে পাটনা আসতে চাইলে, স্বয়ং নেহেরু তাঁকে সেখানে যেতে বারণ করেন!

“এটা কি ভাবে সম্ভব? যে, দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যখন কোন রাজ্যে অবস্থান করছেন; আর সে রাজ্যের রাজ্যপালই অনুপস্থিত”! – দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতির অন্তিম যাত্রায় অংশগ্রহণে ইচ্ছুক সে দেশেরই কোন এক অঙ্গরাজ্যের রাজ্যপালের কাছে সেদিন নেহেরুর তরফে এমনই বার্তা প্রেরিত হয়েছিল। অতয়েব এরপর অনিচ্ছাসত্ত্বেও সম্পূর্ণানন্দ’জীকে তাঁর পাটনা সফর বাতিল করতে হয়।

ভাবছেন এখানেই শেষ?
- না বন্ধুরা, আরও আছে। নেহেরু তৎকালীন রাষ্ট্রপতি, তথা বাবু রাজেন্দ্রপ্রসাদের উত্তরসুরী ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণাণ’কেও একই কারণে পাটনা সফর বাতিল করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু ডঃ রাধাকৃষ্ণাণ সে কথায় কর্ণপাত না করে সোজা রাজেন্দ্রপ্রসাদের অন্ত্যেষ্টিস্থলে পৌঁছে দেশের মানরক্ষা করেন।

আজ আর হয়তো দিল্লী’র রাজঘাটের পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় ডঃ রাজেন্দ্রপ্রসাদের সঙ্গে সেদিনের নেহেরুর বর্বর আচরণের স্মৃতিচারণ করার ক্ষমতা খুব কম মানুষেরই আছে। তবে এটাও তো ঠিক যে, মহাত্মা গান্ধী’র সৌধের পাশে সঞ্জয় গান্ধী’র মত লোকও জায়গা পেতে পারে, কিন্তু ঠাঁই মেলে না – স্বাধীন ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি’র মত মানুষের! এই দেশে তাদের ইজ্জত মেলা ভার!!

- তবে হ্যাঁ, এটা নিঃসঙ্কোচে মনে হতেই পারে যে, এদেশের যাবতীয় মহত্ত্ব আর বলিদানের কপিরাইট কেবল এক গান্ধী-নেহেরু পরিবারের জন্যেই চিরকালীন সংরক্ষিত...!!!

................ ছিঃ !!!!



মন্তব্যগুলি
Upasana Banerjee
Upasana Banerjee Neheru akta joghonno choritro o manosikotar lok. Or jnyo desh vag hoyeche. Or jnyo Pakistan somosya. Or jnyo pak odhikrito kashmir bole akta jayga toiri hoyeche.




Shared by
Pranab Kumar Kundu.

বুধবার, ৩ জানুয়ারি, ২০১৮

মহাকর্ষ ( মাধ্যাকর্ষণ ), অভিকর্ষ ও মহাবিজ্ঞানী ভাস্করাচার্য


    মহাকর্ষ ( মাধ্যাকর্ষণ ), অভিকর্ষ ও মহাবিজ্ঞানী ভাস্করাচার্য


    শেয়ার করেছেন                                                          প্রণব কুমার কুণ্ডু।

প্রশ্নঃ মহাকর্ষ।জড় বস্তুর পরস্পর আকর্ষণ, মাধ্যাকর্ষণ, gravitation. ও অভিকর্ষ, ভূকেন্দ্রাভিমুখে জড় পদার্থের আকর্ষণ, gravitational attraction,  শক্তি সম্পর্কে হিন্দুশাস্ত্র কী বলে ??
এ বিষয়ে হিন্দু বিজ্ঞানীদের কোন অবদান আছে কি???

উত্তর:
আধুনিক বিশ্বে অনেকের ধারণা, মহাকর্ষ ও অভিকর্ষ শক্তি,  নিউটন প্রথম আবিষ্কার করেছেন। 

তবে অনেকেই জানেন না,  যে, এ বিষয়ে হিন্দুদের মূল ধর্মগ্রন্থে, বেদে, স্পষ্টভাবে আলোচনা করা হয়েছে।

সবিতা যন্ত্রৈঃ পৃথিবী মরভণাদস্কম্ভনে সবিতা দ্যামদৃংহৎ।
অশ্বমিবাধুক্ষদ্ধু নিমন্তরিক্ষমতূর্তে বদ্ধং সবিতা সমুদ্রম ॥ 

ঋগ্বেদ, ১০/১৪৯/১

অনুবাদ: সূর্য রজ্জুবৎ আকর্ষণ দ্বারা পৃথিবীকে বাঁধিয়া রাখিয়াছে।

নিরাধার আকাশে দ্যুলোকের অন্যান্য গ্রহকেও,  ইহা সুদৃঢ় রাখিয়াছে।
অচ্ছেদ্য আকর্ষণ রর্জ্জুতে আবদ্ধ, গর্জনশীল গ্রহসমূহ নিরাধার আকাশে অশ্বের ন্যায় পরিভ্রমণ করিতেছে।


দেখুন, আকাশ যে ‘নিরাধার’, এবং ‘রজ্জুবৎ আকর্ষণ’,  অর্থাৎ মহাকর্ষ ( বা মাধ্যাকর্ষণ ) শক্তির দ্বারাই যে সেই নিরাধার আকাশে,  সূর্য ও গ্রহসমূহ নিজ অক্ষরেখায় সুদৃঢ় রয়েছে --
এখানে সেকথা বলা হয়েছে।


বিশ্বের প্রভাবশালী অনেক ধর্মগ্রন্থে, আকাশকে স্পষ্টভাবে ‘পৃথিবীর ছাদ’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। অথচ এই সব ধর্মমতের জন্মেরও হাজার বছর পূর্বে, বেদে আর্য ঋষিগণ আকাশকে ‘নিরাধার’,  অর্থাৎ পৃথিবীকে ও গ্রহসমূহকে শূন্যে ভাসমান বলে,  ঘোষণা করেছিলেন।


আরও লক্ষণীয়, মহাকর্ষ শক্তিতে আবদ্ধ গ্রহসমূহ, যে নিরাধারে অর্থাৎ, মহাশূন্যে স্থির নয়, বরং পরিভ্রমণ করছে, নিজ কক্ষপথে --এই তত্ত্বও আবিষ্কার করেছিলেন বৈদিক ঋষিগণ। এমনকি সূর্য নিজেও, যে তার নিজস্ব কক্ষপথে চলছে সেই অত্যাশ্চর্য গূঢ় বিজ্ঞানও আলোচিত হয়েছে নিম্নের মন্ত্রে :
আকৃষ্ণেন রজসা বর্তমানো নিবেশয়ন্নমৃতং মর্তঞ্চ।
হিরণ্ময়েন সবিতা রথেনা দেবো যাতি ভুবনানি পশ্যন্ ॥ 

ঋগ্বেদ, ১/৩৫/২

অনুবাদ: সূর্য আকর্ষণযুক্ত পৃথিব্যাদি লোক-লোকান্তরকে সঙ্গে রাখিয়া, নশ্বর-অবিনশ্বর উভয় পদার্থকে নিজ নিজ কার্যে নিযুক্ত রাখিয়া এবং মাধ্যাকর্ষণ অর্থাৎ, মহাকর্ষ রূপে,  রথে চড়িয়া যেন সারা লোকান্তর দেখিতে দেখিতে গমন করিতেছে।


খুব অবাক হতে হয়, পৃথিবী যেমন চাঁদকে সঙ্গে নিয়ে সূর্যের চারপাশে প্রদক্ষিণ করছে, সেইরকম, সূর্যও যে তার গ্রহ-উপগ্রহসমূহকে সঙ্গে নিয়ে,  নিজের কক্ষপথে গমন করছে -- এই গভীর জ্ঞানও,  পবিত্র বেদে আলোচিত হয়েছে।


মহাবিজ্ঞানী ভাস্করাচার্য
(১১৫০ খ্রি:) তাঁর ‘সিদ্ধান্ত শিরোমণি’ নামক জ্যোতিঃশাস্ত্রের, গোলাধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন--


“আকৃষ্টি শক্তিশ্চ মহীতয়া যৎ স্বস্থং স্বাভিমুখী করোতি।
আকৃষ্যতে তৎ পততীব ভাতি সমে সমন্তাৎ কুবিয়ং প্রতীতিঃ॥”


অর্থাৎ “সর্ব পদার্থের মধ্যে এক আকর্ষণ শক্তি বিদ্যমান রহিয়াছে, যে শক্তি দ্বারা পৃথিবী,  আকাশস্থ পদার্থকে নিজের দিকে লইয়া আসে।
যাহাকে ইহা আকর্ষণ করে তাহা পতিত হইল বলিয়া মনে হয়।”


অর্থাৎ প্রাচীন ঋগ্বেদ শাস্ত্রের পাশাপাশি,  ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করলেও হিন্দু বিজ্ঞানী ভাস্করাচার্য (১১১৪-১১৮৫), বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটনের (১৬৪২-১৭২৭) জন্মেরও কমপক্ষে পাঁচশত বছর পূর্বে,  মহাকর্ষ শক্তি আবিষ্কার করে তাঁর গ্রন্থ, ‘সিদ্ধান্ত শিরোমণি’তে আলোচনা করে গিয়েছেন!!!




গাংনাপুরের দেবগ্রাম


   গাংনাপুরের দেবগ্রাম

   শেয়ার করেছেন                                   প্রণব কুমার কুণ্ডু।

সমাজ বিবর্তন ও পুরাতত্ত্বের আলোকে নদীয়া জেলার এক বিলুপ্ত জনপদ-- দেবল রাজার গড় বা দেবগ্রাম।
একটি অদ্ভুত কিন্তু অবহেলিত জায়গা হচ্ছে দেবগ্রাম, জীবন্ত প্রত্নক্ষেত্র বলা যায়।এখানে ধানজমিতে চাষ করতে গেলে, লাঙ্গলের ডগায় উঠে আসে কোন সেই প্রাচীন, সম্ভবত পাল যুগের মূর্তি বা জলপ্রদীপ, সেন যুগের ঘর গেরস্থালির হাঁড়ি- কুঁড়ি অথবা সুলতানি আমলের সুরাপাত্র, হুঁকো, কলসি ইত্যাদি।মাটির সামান্য নিচেই অসংখ্য মৃৎপাত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নল পুকুর, বিল পাড়া, পন্ডে পাড়া প্রভৃতি অঞ্চলে।এইসব জায়গায় রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে মাড়িয়ে যেতে হয় হাজার বছরের প্রাচীন ঐতিহাসিক সামগ্রী।পুকুর খুঁড়লে বেরিয়ে আসে বিশাল বিশাল পাথরের ব্লক, প্রাচীন ইট, সে ইট বিভিন্ন প্রকারের, ছোট থেকে শীল পাটার চেয়েও বড়।
এখানকার চাষিরা, জনমজুরেরা, সাধারণ মানুষেরা, বুঝে উঠতে পারছেন না,  এই যে জিনিসগুলি উঠে আসছে, সেগুলি নিয়ে কি করবে তাঁরা।কিন্তু এটুকু তাঁরা খুব ভালো করে বুঝতে পারছেন, এসব জিনিষ অতি প্রাচীন, যতক্ষণ না সরকার বা কোনো বিশ্ববিদ্যালয় অধিগ্রহণ করছে, ততদিন এদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
শুনলে আশ্চর্য হবেন,  গ্রামের মানুষেরা নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে একটা আস্ত প্রত্নতাত্ত্বিক সংগ্রহশালা বানিয়ে ফেলেছেন।এদের সঙ্গে আছেন কয়েকজন উৎসাহী তরুণ ও যুবক যেমন ডা: বিশ্বজিৎ রায়, সঞ্জয় ভৌমিক, অনির্বান বসু, দেবজিৎ বিশ্বাস ইত্যাদি।
প্রতিদিনই কেউ না কেউ, কিছু না কিছু জিনিষ দিয়ে যাচ্ছে, এতে করে সংগ্রহশালায় আর নতুন করে কিছু রাখার স্থান অকুলান হয়ে গেছে।
সমগ্র দেবগ্রামবাসীরা অতিশয় উৎসাহী এই ঐতিহাসিক সম্পদ গুলি বাঁচাতে, কিন্তু বিদ্যোৎসাহী পন্ডিতেরা এবং পুরাতাত্ত্বিক কর্তৃপক্ষ এগিয়ে না এলে এভাবে বেশিদিন চলতে পারে না।দরকার বিজ্ঞান সম্মত খনন, সংরক্ষণ এবং বিশেষজ্ঞের মতামত।
এখানে পৌঁছাতে গেলে, সরাসরি চাকদহ বা রানাঘাট স্টেশনে এসে নেমে, যাওয়া যায়।ডা: বিশ্বজিৎ রায়-এর ব্যক্তিগত ভাবে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছেন , দেবগ্রাম নিয়ে অবহিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।আশায় রইলাম দেবগ্রামে একদিন চন্দ্র কেতুগরের মতন কর্মকান্ড শুরু হবে।
এখানে চাষিরা জমির মধ্যে যেসব জিনিষ পেয়েছেন, তার গুটিকয়েক ছবি তুলে ধরছি।এগুলি তাঁদের সংগ্রহশালায় রাখা আছে।
এই দেবগ্রাম, গাংনাপুর-এর দেবগ্রাম ! পলাশী'র আগের দেবগ্রাম নয় !



INQUILAB ZINDABAD


INQUILAB  ZINDABAD

Shared by                                Pranab Kumar Kundu.






India remembers Maulana Hasrat Mohani who gave the revolutionary slogan 'Inquilab Zindabad' !

This great freedom fighter, also a noted Urdu poet, gave the revolutionary slogan 'Inquilab Zindabad' during the country's freedom struggle in 1921.

By Zee Media Bureau | Updated: Jan 02, 2017, 17:56 PM IST

Comments | 
India remembers Maulana Hasrat Mohani who gave the revolutionary slogan "Inquilab Zindabad" !

New Delhi: Fans and followers of veteran freedom fighter and noted Urdu poet Maulana Hasrat Mohani paid rich tribute on his birth anniversary on Sunday.

Hasrat Mohani was born in 1875 in Unnao in Uttar Pradesh.

This great freedom fighter, also a noted Urdu poet, gave the revolutionary slogan 'Inquilab Zindabad' during the country's freedom struggle in 1921.

Hasrat Mohani, whose real name was Syed Fazl-ul-Hasan, was a versatile Urdu poet who had penned many remarkable poems with the pen name Hasrat Mohani.

He had immense love and devotion for Lord Krishna which reflected in his verses. He had also frequently visited Mathura to celebrate Krishna Janmashtami.

Today Freedom Fighter Maulana Hasrat Mohani Was Born In 1875 In Unnao ,Uttar Pradesh. He Gave The Revolutionary Slogan 'Inquilab Zindabad' !



Hasrat Mohani, who studied at Aligarh Muslim University, had joined the freedom struggle with Bal Gangadhar Lokmanya Tilak.

Some of his literary works included “Kulliyat-e-Hasrat Mohani”, “Sharh-e-Kalam-e-Ghalib”, “Nukaat-e-Sukhan” and “Mushahidaat-e-Zindaan”.

He had also penned the popular ghazal song “Chupke Chupke Raat Din” sung by Ghulam Ali and Jagjit Singh.

Hasrat Mohani was jailed for many years by the British authorities for participating in the Indian struggle movement.

Maulana Hasrat Mohani died on 13 May 1951 in Lucknow.

মঙ্গলবার, ২ জানুয়ারি, ২০১৮

ইংরেজি ক্যালেন্ডারের কথা


    ইংরেজি ক্যালেন্ডারের কথা

    শেয়ার করেছেন              প্রণব কুমার কুণ্ডু

যিশুখ্রিস্ট যদি বেঁচে থাকতেন, তাহলে আজ তার বয়স হত ২০১৮ বছর।
অন্তত, অর্থানুসারে তাই হওয়া উচিৎ। খ্রিস্ট জন্ম থেকেই তো খ্রিস্টাব্দ। কিন্তু তাহলে তো যিশুর জন্ম পয়লা জানুআরি হওয়া উচিৎ। সে তো নয়, আমরা তো পঁচিশে ডিসেম্বর.......
মাঝখানের ছ’ছটা দিন কোথায় গায়েব হয়ে গেল?
ছোটবেলায় প্রশ্নটা আমাকে ভাবাত খুব। আর তখন তো হাতের কাছে সবজান্তা গুগল ছিল না। যাই হোক, পরবর্তীতে এই নিয়ে ঘাঁটাঘাটি করে যা পেলাম, তাতে তো আরও চমকে চুয়াল্লিশ। জন্ম তারিখের কথা বাদ দিন, গবেষকরা বলছেন, যিশুর জন্ম চার খ্রিস্টপূর্বাব্দে। বুঝুন ঠ্যালা! যিশুর জন্ম নাকি যিশুর জন্মের চার বছর আগেই!
তাহলে আসুন, এই বিষয়ে যা পড়াশুনা করেছি তারই নির্যাসের এই লেখা, শোনাই খ্রিস্টাব্দের ইতিকথা।
প্রথমে আসি, বারোটি মাসের নামকরণ বিষয়ে।
সেপ্টেম্বর কথাটি এসেছে সংস্কৃত ‘সপ্তম’ বা ল্যাটিন ‘সেপ্টেম’ থেকে।
রে রে করার কিছু নেই; ল্যাটিন ভাষা তথা সমস্ত ইয়োরোপিয় ভাষার জন্ম সংস্কৃত থেকেই।
তেমনি, অক্টোবর এসেছে, অষ্টম বা অক্টা থেকে, নবম বা নভেম থেকে নভেম্বর, দশম বা ডিসেম থেকে ডিসেম্বর।
জানি ভাবছেন, সেপ্টেম্বর তো সপ্তম মাস নয়, নবম মাস, তেমনি অক্টোবর, নভেম্বর, ডিসেম্বরও যথাক্রমে দশম, একাদশ আর দ্বাদশ। আরে দাদা, দিদিরা, রসুন (গার্লিক না কিন্তু)।
বিদ্যা বুদ্ধিতে, শক্তিতে, সে সময় রোম সাম্রাজ্যের খুব নামডাক ছিল। এই রোমানরা একপ্রকার ক্যালেন্ডার ব্যবহার করত। সম্ভবত রোমান সম্রাট রোমুলাস ৭৩৮ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে এই ক্যালেন্ডার চালু করেন। এতে থাকত দশটি মাস, যার শুরু, মার্চ মাসে, আর শেষ ডিসেম্বরে। সেই হিসাবে দাদা দিদিরা, সাতে সেপ্টেম্বর, আটে অক্টোবর, নয়ে নভেম্বর আর দশে ডিসেম্বর।
ছয়ে ছিল সেক্সটিলিস, আর পাঁচে কুইন্টিলিস, যে দুটো মাসকে এখন আমরা অগাস্ট, আর জুলাই নামে চিনি।
জুন মাসের নামকরণ হয়েছে রোমান দেবতা জুপিটারের স্ত্রী জুনোর নামে, মে হয়েছে ‘মেইয়া’, এপ্রিল ‘আফ্রেদিৎ’ আর মার্চ যুদ্ধের দেবতা মার্সের নামে।
দশ মাসের বছরে ছিল মোট তিনশ চার দিন। স্বভাবতই এই ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে চাষবাস, পালাপার্বণ কিছুই ঠিকমতো করা যেত না। তার ওপর, রাজা মহারাজারা ইচ্ছাখুশি ক্যালেন্ডারে দিন-টিন বাড়িয়ে কমিয়ে দিতেন।
পরবর্তী কালে সম্রাট নুমা এর সঙ্গে আরও দুটি মাস জানুআরি, আর ফেব্রুআরি যোগ করেন। বাইশ দিনের একটি তেরোতম মাসও সে সময় ক্যালেন্ডারে এসেছিল, যেটি এক বছর অন্তর অন্তর ক্যালেন্ডারে জায়গা পেত। মাসটির নাম ছিল মার্সিডানাস।
মিশরিয়রা সে সময় জ্যোতির্বিদ্যায় অনেকখানি পারঙ্গম হয়ে উঠেছিল। আটচল্লিশ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার মিশর থেকে একটি ক্যালেন্ডার আমদানি করেন, ও পরিমার্জন করে রাজ্যে তিনশ সাড়ে পঁয়ষট্টি দিনে সৌরবৎসর, এরকম ক্যালেন্ডার চালু করেন, আর জানুআরি, আর ফেব্রুআরি, এই দুটি মাসকে বছরের শুরুতে নিয়ে আসেন।
শুরুতে ফেব্রুআরি মাস ত্রিশ দিনেরই ছিল। কুইন্টিলিসও ছিল ত্রিশ দিনের মাস, জুলিয়াস সিজার তার জন্মমাস কুইন্টিলিস এর নাম পরবর্তন করে জুলাই করেন। কিন্তু রাজার নামে মাস; অন্য মাসের চেয়ে ছোট হয় কী করে? তাই ফেব্রুআরি থেকে এক দিন কেটে জুলাই মাসটি একত্রিশ দিনের করেন।
জুলিয়াস সিজারের পরবর্তী রোমান সম্রাট সিজার অগাস্টাস সেক্সটিলিস মাসটির নাম পরিবর্তন করে অগাস্ট করেন; এবং এবারও একই ভাবে বেচারা ফেব্রুআরির আরেকটি দিন কাটা যায়।
জুলিয়াস সিজারের নামে এই ক্যালেন্ডার ‘জুলিয়ান ক্যালেন্ডার’ নামে পরিচিত হয়, কিন্তু তখন খ্রিস্টই নেই; তাই খ্রিস্টাব্দও নেই।
সময়ের হিসাবে ৫২৫ খ্রিস্টাব্দে, তখন বাইজানটিয়াম শাসকদের অব্দ প্রচলিত ছিল, যারা কি না বহু খ্রিশ্চান নিধনের সঙ্গে যুক্ত, সে সময় পোপ ডাইনোসিস এক্সিগুয়াস হিসাব নিকাশ করে একেবারে ৫২৫ AD চালু করেন।
২১ শে মার্চ মহাবিষুব, তার চার দিন পর, অর্থাৎ ২৫ শে মার্চ খ্রিস্টানদের একটি অতি পবিত্র দিন। ওই দিন গ্যাব্রিয়েল মেরিকে দর্শন দিয়ে যিশুর আগমনের সুসমাচার দিয়েছিল। আর ২১ শে মার্চ থেকে নয় মাস পরে অর্থাৎ ২৫শে ডিসেম্বর দিনটিকে যিশুর জন্মদিন ধরা হয়।
ত্রয়োদশ শতাব্দীতে পোপ গ্রেগরি লক্ষ করলেন, জুলিয়ান ক্যালেন্ডারে মহাবিষুবের তারিখ হচ্ছে ১০ই মার্চ, অর্থাৎ জুলিয়ান ক্যালেন্ডার ১১ দিন পিছিয়ে পড়েছে। তিনিই জ্যোতির্বিদের সঙ্গে পরামর্শ করে ক্যালেন্ডারে ১১ দিন যোগ করেন, লিপ ইয়ারের নিয়ম চালু করেন।
১৭৫২ খ্রিস্টাব্দে ইংলন্ড আইন করে জুলিয়ান ক্যালেন্ডার বাতিল করে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার গ্রহণ করে। পরে পৃথিবীর প্রায় সমস্ত দেশই এই ক্যালেন্ডার মেনে চলতে শুরু করে।
ইস্টান অর্থোডক্সিয়ানরা গ্রেগরের এই সংস্কার মানে নি। তাই ওরা ২৫শে ডিসেম্বরের সঙ্গে ১১ দিন যোগ করে ৬ই জানুআরি বড়দিন পালন করেন। বর্তমানে আর্মেনিয়াতে ও আরও কয়েকটি দেশে ৬ই জানুআরি বড়দিন।
রাশিয়া অনেক পরে, (১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে রুশ বিপ্লবের পরে) গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার গ্রহণ করে। ১৯০৮ সালে লন্ডন অলিম্পিকে রাশিয়ান দল ১১ দিন পরে পৌঁছায়।
অনেক কথাই বাকি থেকে গেল। পরে হবে। ভালো থাকুন। ২০১৮ শুভ হোক।
লিখেছেন বিরাজ মুখার্জি।


আরও প্র

সোমবার, ১ জানুয়ারি, ২০১৮

জসীম উদ্দীন


জসীম উদ্দীন

শেয়ার করেছেন                        প্রণব কুমার কুণ্ডু।

পল্লী কবি
জসীম উদ্ দীন (জন্মঃ- ১ জানুয়ারি, ১৯০৩ - মৃত্যুঃ- ১৩ মার্চ, ১৯৭৬)
তিনি বাংলায় 'পল্লী কবি' হিসেবে পরিচিত। তাঁর লেখা কবর কবিতাটি বাংলা সাহিত্যে এক অবিস্মরণীয় অবদান। নকশী কাঁথার মাঠ কবির শ্রেষ্ঠ রচনা যা বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। নকশী কাঁথার মাঠ ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত বাংলা সাহিত্যের একটি অনবদ্য আখ্যানকাব্য। বাংলা কবিতার জগতে যখন ইউরোপীয় ধাঁচের আধুনিকতার আন্দোলন চলছিল তখন প্রকাশিত এই কাব্যকাহিনী ঐতিহ্যগত ধারার শক্তিমত্তাকে পুনঃপ্রতিপন্ন করে। এটি জসীমউদ্দীনের একটি অমর সৃষ্টি হিসাবে বিবেচিত। কাব্যগ্রন্থটি ইংরেজিতে অনূদিত হয়ে বিশ্বপাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিল।
প্রাথমিক জীবন
তিনি ফরিদপুর জেলার তাম্বুলখানা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার বাড়ি ছিলো একই জেলার গোবিন্দপুর গ্রামে। বাবার নাম আনসার উদ্দিন মোল্লা। তিনি পেশায় একজন স্কুল শিক্ষক ছিলেন। মা আমিনা খাতুন ওরফে রাঙাছুট। জসীম উদ্ দীন ফরিদপুর ওয়েলফেয়ার স্কুল, ও পরবর্তীতে ফরিদপুর জেলা স্কুল থেকে পড়ালেখা করেন। এখান থেকে তিনি তার প্রবেশিকা পরীক্ষায় ১৯২১ সনে উত্তীর্ণ হন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি. এ. এবং এম. এ. শেষ করেন যথাক্রমে ১৯২৯ এবং ১৯৩১ সনে। ১৯৩৩ সনে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. দীনেশ চন্দ্র সেনের অধীনে রামতনু লাহিড়ী গবেষণা সহকারী পদে যোগ দেন। এরপর ১৯৩৮ সনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন।
১৯৬৯ সনে রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কবিকে সম্মান সূচক ডি লিট উপাধিতে ভূষিত করেন। তিনি ১৩ মার্চ ১৯৭৬ সনে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। পরে তাকে তাঁর নিজ গ্রাম গোবিন্দপুরে সমাধিস্থ করা হয়।
গ্রন্থাবলী
কাব্যগ্রন্থ
রাখালী (১৯২৭)
নকশী কাঁথার মাঠ (১৯২৯)
বালু চর (১৯৩০)
ধানখেত (১৯৩৩)
সোজন বাদিয়ার ঘাট (১৯৩৪)
হাসু (১৯৩৮)
রঙিলা নায়ের মাঝি(১৯৩৫)
রুপবতি (১৯৪৬)
মাটির কান্না (১৯৫১)
এক পয়সার বাঁশী (১৯৫৬)
সকিনা (১৯৫৯)
সুচয়নী (১৯৬১)
ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে (১৯৬২)
মা যে জননী কান্দে (১৯৬৩)
হলুদ বরণী (১৯৬৬)
জলে লেখন (১৯৬৯)
কাফনের মিছিল ((১৯৮৮)
নাটক
পদ্মাপার (১৯৫০)
বেদের মেয়ে (১৯৫১)
মধুমালা (১৯৫১)
পল্লীবধূ (১৯৫৬)
গ্রামের মেয়ে (১৯৫৯)
ওগো পুস্পধনু (১৯৬৮)
আসমান সিংহ (১৯৮৬)
আত্মকথা
যাদের দেখেছি ((১৯৫১)
ঠাকুর বাড়ির আঙ্গিনায় (১৯৬১)
জীবন কথা ( ১৯৬৪)
স্মৃতিপট (১৯৬৪)
উপন্যাস
বোবা কাহিনী (১৯৬৪)
ভ্রমণ কাহিনী
চলে মুসাফির (১৯৫২)
হলদে পরির দেশে ( ১৯৬৭)
যে দেশে মানুষ বড় (১৯৬৮)
জার্মানীর শহরে বন্দরে (১৯৭৫)
সঙ্গীত
জারি গান (১৯৬৮)
মুর্শিদী গান (১৯৭৭)
অন্যান্য
বাঙালির হাসির গল্প
ডালিমকুমার (১৯৮৬)
পুরস্কার
প্রেসিডেন্টস এওয়ার্ড ফর প্রাইড অফ পারফরমেন্স ১৯৫৮
একুশে পদক ১৯৭৬
স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার ১৯৭৮ (মরণোত্তর)
১৯৭৪ সনে তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন।
রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি. লিট ডিগ্রি (১৯৬৯)
নকশী কাঁথার মাঠ ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত বাংলা সাহিত্যের একটি অনবদ্য আখ্যানকাব্য। বাংলা ভাষায় রচিত এই আখ্যানকাব্যের লেখক বাংলাদেশের পল্লীকবি জসীমউদ্দীন। বাংলা কবিতার জগতে যখন ইউরোপীয় ধাঁচের আধুনিকতার আন্দোলন চলছিল তখন প্রকাশিত এই কাব্যকাহিনী ঐতিহ্যগত ধারার শক্তিমত্তাকে পুন:প্রতিপন্ন করে। এটি জসীমউদ্দীনের একটি অমর সৃষ্টি হিসাবে বিবেচিত। কাব্যগ্রন্থটি ইংরেজিতে অনূদিত হয়ে বিশ্বপাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিল। নকশী কাঁথার মাঠ কাব্যোপন্যাসটি রূপাই ও সাজু নামক দুই গ্রামীণ যুবক-যুবতীর অবিনশ্বর প্রেমের করুণ কাহিনী কাহিনী। এই দুজনই ছিলেন বাস্তব চরিত্র।
কাহিনী সংক্ষেপ
নকশী কাঁথার মাঠ-এর নায়ক রূপাই গাঁয়ের ছেলে, কৃষ্ণকায়, কাঁধ পর্যন্ত চুল। তার কতগুলো গুণ আছে: সে ভালো ঘর ছাইতে জানে, যে হাত দিয়ে সে সুন্দর ঘর ছায়, সেই হাতেই লড়কি চালাতে জানে, সড়কি চালাতে জানে, আবার বাঁশের বাঁশিতে তার মতো আড় আর কেউ দিতে পারে না, এমনকি তার মতো আর কেউ গান গাইতেও পারে না। এই রূপাইয়ের সঙ্গে পাশের গ্রামের মেয়ে সাজুর ভালোবাসা হয়, আর তারপর হয় বিয়ে। তারা সুখের সংসার পাতে। একদিন গভীর রাতে চাঁদ ওঠে, গোবর নিকানো আঙিনায় মাদুর পেতে সাজু রূপাইয়ের কোলে শুয়ে রয়, তাই একসময় বাঁশির বাজনা থেমে যায়। কারণ যাকে শোনানোর জন্য রূপাই এতদিন বাঁশি বাজিয়েছে, সেই মানুষটি এখন তারই ঘরে। সেদিন রাতের পূর্ণিমার আলোতে সাজুর রূপ দেখে দারুণ মুগ্ধ হয় রূপাই, কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে কী যেন এক সংশয় জেগে ওঠে। সে ভাবে, এত সুখ আমার সইবে তো! এক অজানা আশঙ্কায় তার অন্তরের বেদনাশ্রু সাজুর কোমল মুখের ওপর পড়ে, সাজুর ঘুম ভেঙে যায়, স্বামীর চোখে জলের ধারা দেখে সাজু বলে, তুমি কাঁদছ কেন? তোমাকে তো আমি কোনো আঘাত দিইনি। রূপাই বলে, এক অজানা আশঙ্কায় কাঁদছি। সাজু বলে, না না, আমরা তো কোনো অন্যায় করিনি। এমন সময় হঠাৎ খবর আসে, বনগেঁয়োরা তাদের গাজনা-চরের পাকা ধান কেটে নিয়ে যাচ্ছে। রূপাই ছুটে যায় লড়কি-সড়কি হাতে বনগেঁয়োদের প্রতিরোধ করতে। সেখানে লড়াই হয় (স্থানীয় ভাষায় কাইজ্জা), কয়েকটি খুন হয় এবং ফলশ্রুতিতে রূপাই ফেরারি হয়ে যায়। আর সাজু রোজ একটা পিদিম বা মাটির প্রদীপ জ্বালিয়ে বসে থাকে রূপাইয়ের পথ চেয়ে। একটা মরা পাতা ঝরে পড়লেও রূপাই-বিরহিণী সাজু, পাতার শব্দ লক্ষ করে আলোটা নিয়ে ছুটে যায়, কোথায় রূপাই? দিন চলে যায়। একদিন গভীর রাতে রূপাই এসে দাঁড়ায় সাজুর সামনে। সাজু দেখে, রূপাইয়ের সারা গায়ে মাটি মাখা, রক্তের দাগও লেগে আছে কোথাও কোথাও। সাজু তাকে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘তোমাকে আর যেতে দেবো না।’ রূপাই বলেছে, ‘আমার না যেয়ে উপায় নেই, যেতেই হবে। কেননা, আমি যদি ধরা পড়ি, আমার ফাঁসি অথবা কালাপানি হবে।’ সাজু এখানে বলেছিল, ‘তুমি তো চলে যাবে আমাকে কার কাছে তুমি রেখে যাবে’, তখন রূপাই বলে,
“ সখী দীন দুঃখীর যারে ছাড়া কেহ নাই
সেই আল্লার হাতে আজি আমি তোমারে সঁপিয়া যাই।
মাকড়ের আঁশে হস্তী যে বাঁধে, পাথর ভাসায় জলে
তোমারে আজিকে সঁপিয়া গেলাম তাঁহার চরণতলে। ”
ইহলোকে রূপাইয়ের সঙ্গে সাজুর এই ছিল শেষ দেখা। সাজু আর কী করবে, সেই প্রথম দেখা ও বৃষ্টির জন্য কুলা নামানোর দিনের দৃষ্টি বিনিময় থেকে শুরু করে তাদের জীবনের সব কথাকে এমনকি যে রাতে রূপাই জন্মের মতো চলে গেল, এসব অতীত স্মৃতি কাঁথার ওপর ফুটিয়ে তুলতে লাগলো সুঁই-সুতা দিয়ে। যেদিন সেই কাঁথা বোনা শেষ হয়ে গেলো, সাজু তার মায়ের কাছে দিয়ে বললো, ‘মা, আমার মরণের পরে যেখানে কবর দেওয়া হবে, সেই কবরের ওপরে যেন এই নকশী কাঁথাখানা বিছিয়ে দেওয়া হয়। আর যদি কোনোদিন রূপাই এসে আমার খোঁজ করে, তাকে বোলো, তোমার আশায় সাজু ওই কবরের নিচে আছে।’
বহুদিন পরে গাঁয়ের কৃষকেরা গভীর রাতে বেদনার্ত এক বাঁশির সুর শুনতে পায়, আর ভোরে সবাই এসে দেখে, সাজুর কবরের পাশে এক ভিনদেশি লোক মরে পড়ে আছে। কবি জসীমউদ্দীন এই আখ্যানের একেবারে শেষ পর্বে এর করুণ বেদনাকে প্রকাশ করতে লিখেছেন:
“ আজো এই গাঁও অঝোরে চাহিয়া ওই গাঁওটির পানে
নীরবে বসিয়া কোন্ কথা যেন কহিতেছে কানে কানে। ”
শুধু তা-ই নয়, তিনি এ কাহিনীর বেদনাকে বিস্তার করে দিতে আরও লিখেছেন,
“ কেহ কেহ নাকি গভীর রাত্রে দেখেছে মাঠের পরে
মহা-শূন্যেতে উড়াইছে কেবা নকসী কাঁথাটি ধরে
হাতে তার সেই বাঁশের বাঁশিটি বাজায় করুণ সুরে
তারি ঢেউ লাগি এ-গাঁও ওগাঁও গহন ব্যথায় ঝুরে। ”
অনুবাদ
১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে প্রথম প্রকাশের পর এই কাব্যগ্রন্থটি ইংরেজিতে ই. এম. মিলফোর্ড কর্তৃক অনুদিত হয় The Field of Embroidered Quilt নামে।
ফুল নেয়া ভাল নয়
- জসীম উদ্‌দীন
ফুল নেয়া ভাল নয় মেয়ে।
ফুল নিলে ফুল দিতে হয়, -
ফুলের মতন প্রাণ দিতে হয়।
যারা ফুল নিয়ে যায়,
যারা ফুল দিয়ে যায়,
তারা ভুল দিয়ে যায়,
তারা কুল নিয়ে যায়।
তুমি ফুল, মেয়ে! বাতাসে ভাঙিয়া পড়
বাতাসের ভরে দলগুলি নড়নড়।
ফুলের ভার যে পাহাড় বহিতে নারে
দখিনা বাতাস নড়ে উঠে বারে বারে।
ফুলের ভারে যে ধরণী দুলিয়া ওঠে,
ভোমর পাখার আঘাতে মাটিতে লোটে।
সেই ফুল তুমি কেমনে বহিবে তারে,
ফুল তো কখনো ফুলেরে বহিতে নারে।
মামার বাড়ি
- জসীম উদ্‌দীন
আয় ছেলেরা, আয় মেয়েরা,
ফুল তুলিতে যাই
ফুলের মালা গলায় দিয়ে
মামার বাড়ি যাই।
মামার বাড়ি পদ্মপুকুর
গলায় গলায় জল,
এপার হতে ওপার গিয়ে
নাচে ঢেউয়ের দল।
দিনে সেথায় ঘুমিয়ে থাকে
লাল শালুকের ফুল,
রাতের বেলা চাঁদের সনে
হেসে না পায় কূল।
আম-কাঁঠালের বনের ধারে
মামা-বাড়ির ঘর,
আকাশ হতে জোছনা-কুসুম
ঝরে মাথার ‘পর।
রাতের বেলা জোনাক জ্বলে
বাঁশ-বাগানের ছায়,
শিমুল গাছের শাখায় বসে
ভোরের পাখি গায়।
ঝড়ের দিনে মামার দেশে
আম কুড়াতে সুখ
পাকা জামের শাখায় উঠি
রঙিন করি মুখ।
কাঁদি-ভরা খেজুর গাছে
পাকা খেজুর দোলে
ছেলেমেয়ে, আয় ছুটে যাই
মামার দেশে চলে।
পল্লী জননী
- জসীম উদ্‌দীন
রাত থম থম স্তব্ধ, ঘোর-ঘোর-আন্ধার,
নিশ্বাস ফেলি, তাও শোনা যায়, নাই কোথা সাড়া কার।
রুগ্ন ছেলের শিয়রে বিসয়া একেলা জাগিছে মাতা,
করুণ চাহনি ঘুম ঘুম যেন ঢুলিছে চোখের পাতা।
শিয়রের কাছে নিবু নিবু দীপ ঘুরিয়া ঘুরিয়া জ্বলে,
তারি সাথে সাথে বিরহী মায়ের একেলা পরাণ দোলে।
ভন্ ভন্ ভন্ জমাট বেঁধেছে বুনো মশকের গান,
এঁদো ডোবা হতে বহিছে কঠোর পচান পাতার ঘ্রাণ?
ছোট কুঁড়ে ঘর, বেড়ার ফাঁকেতে আসিছে শীতের বায়ু,
শিয়রে বসিয়া মনে মনে মাতা গণিছে ছেলের আয়ু।
ছেলে কয়, “মারে, কত রাত আছে? কখন সকাল হবে,
ভাল যে লাগে না, এমনি করিয়া কেবা শুয়ে থাকে কবে?”
মা কয়“বাছারে ! চুপটি করিয়া ঘুমা ত একটি বার, ”
ছেলে রেগে কয় “ঘুম যে আসে না কি করিব আমি তার ?”
পান্ডুর গালে চুমো খায় মাতা, সারা গায়ে দেয় হাত,
পারে যদি বুকে যত স্নেহ আছে ঢেলে দেয় তারি সাথ।
নামাজের ঘরে মোমবাতি মানে, দরগায় মানে দান,
ছেলেরে তাহার ভাল কোরে দাও, কাঁদে জননীর প্রাণ।
ভাল করে দাও আল্লা রছুল। ভাল কোরে দাও পীর।
কহিতে কহিতে মুখখানি ভাসে বহিয়া নয়ন নীর।
বাঁশবনে বসি ডাকে কানা কুয়ো, রাতের আঁধার ঠেলি,
বাদুড় পাখার বাতাসেতে পড়ে সুপারীর বন হেলি।
চলে বুনোপথে জোনাকী মেয়েরা কুয়াশা কাফন ধরি,
দুর ছাই। কিবা শঙ্কায় মার পরাণ উঠিছে ভরি।
যে কথা ভাবিতে পরাণ শিহরে তাই ভাসে হিয়া কোণে,
বালাই, বালাই, ভালো হবে যাদু মনে মনে জাল বোনে।
ছেলে কয়, “মাগো! পায়ে পড়ি বলো ভাল যদি হই কাল,
করিমের সাথে খেলিবারে গেলে দিবে না ত তুমি গাল?
আচ্ছা মা বলো, এমন হয় না রহিম চাচার ঝাড়া
এখনি আমারে এত রোগ হোতে করিতে পারি ত খাড়া ?”
মা কেবল বসি রুগ্ন ছেলের মুখ পানে আঁখি মেলে,
ভাসা ভাসা তার যত কথা যেন সারা প্রাণ দিয়ে গেলে।
“শোন মা! আমার লাটাই কিন্তু রাখিও যতন করে,
রাখিও ঢ্যাঁপের মোয়া বেঁধে তুমি সাত-নরি শিকা পরে।
খেজুরে-গুড়ের নয়া পাটালিতে হুড়ুমের কোলা ভরে,
ফুলঝুরি সিকা সাজাইয়া রেখো আমার সমুখ পরে।”
ছেলে চুপ করে, মাও ধীরে ধীরে মাথায় বুলায় হাত,
বাহিরেতে নাচে জোনাকী আলোয় থম থম কাল রাত।
রুগ্ন ছেলের শিয়রে বসিয়া কত কথা পড়ে মনে,
কোন দিন সে যে মায়েরে না বলে গিয়াছিল দুর বনে।
সাঁঝ হোয়ে গেল আসেনাকো আই-ঢাই মার প্রাণ,
হঠাৎ শুনিল আসিতেছে ছেলে হর্ষে করিয়া গান।
এক কোঁচ ভরা বেথুল তাহার ঝামুর ঝুমুর বাজে,
ওরে মুখপোড়া কোথা গিয়াছিলি এমনি এ কালি-সাঁঝে?
কত কথা আজ মনে পড়ে মার, গরীবের ঘর তার,
ছোট খাট কত বায়না ছেলের পারে নাই মিটাবার।
আড়ঙের দিনে পুতুল কিনিতে পয়সা জোটেনি তাই,
বলেছে আমরা মুসলমানের আড়ঙ দেখিতে নাই।
করিম যে গেল? রহিম চলিল? এমনি প্রশ্ন-মালা;
উত্তর দিতে দুখিনী মায়ের দ্বিগুণ বাড়িত জ্বালা।
আজও রোগে তার পথ্য জোটেনি, ওষুধ হয়নি আনা,
ঝড়ে কাঁপে যেন নীড়ের পাখিটি জড়ায়ে মায়ের ডানা।
ঘরের চালেতে ভুতুম ডাকিছে, অকল্যাণ এ সুর,
মরণের দুত এল বুঝি হায়। হাঁকে মায়, দুর-দুর।
পচা ডোবা হতে বিরহিনী ডা’ক ডাকিতেছে ঝুরি ঝুরি,
কৃষাণ ছেলেরা কালকে তাহার বাচ্চা করেছে চুরি।
ফেরে ভন্ ভন্ মশা দলে দলে বুড়ো পাতা ঝরে বনে,
ফোঁটায় ফোঁটায় পাতা-চোঁয়া জল গড়াইছে তার সনে।
রুগ্ন ছেলের শিয়রে বসিয়া একেলা জাগিছে মাতা।
সম্মুখে তার ঘোর কুজঝটি মহা-কাল-রাত পাতা।
পার্শ্বে জ্বলিয়া মাটির প্রদীপ বাতাসে জমায় খেলা,
আঁধারের সাথে যুঝিয়া তাহার ফুরায়ে এসেছে তেল।
আমার বাড়ি
- জসীম উদ্‌দীন
আমার বাড়ি যাইও ভোমর,
বসতে দেব পিঁড়ে,
জলপান যে করতে দেব
শালি ধানের চিঁড়ে।
শালি ধানের চিঁড়ে দেব,
বিন্নি ধানের খই,
বাড়ির গাছের কবরী কলা,
গামছা-বাঁধা দই।
আম-কাঁঠালের বনের ধারে
শুয়ো আঁচল পাতি,
গাছের শাখা দুলিয়ে বাতাস
করব সারা রাতি।
চাঁদমুখে তোর চাঁদের চুমো
মাখিয়ে দেব সুখে
তারা ফুলের মালা গাঁথি,
জড়িয়ে দেব বুকে।
গাই দোহনের শব্দ শুনি
জেগো সকাল বেলা,
সারাটা দিন তোমায় লয়ে
করব আমি খেলা।
আমার বাড়ি ডালিম গাছে
ডালিম ফুলের হাসি,
কাজলা দীঘির কাজল জলে
কাঁসগুলি যায় ভাসি।
আমার বাড়ি যাইও ভোমর,
এই বরাবর পথ,
মৌরী ফুলের গন্ধ শুঁকে
থামিও তব রথ।
পল্লী-বর্ষা
- জসীম উদ্‌দীন---ধান ক্ষেত
আজিকের রোদ ঘুমায়ে পড়িয়া ঘোলাট-মেঘের আড়ে,
কেয়া-বন পথে স্বপন বুনিছে ছল ছল জল-ধারে।
কাহার ঝিয়ারী কদম্ব-শাখে নিঝ্ঝুম নিরালায়,
ছোট ছোট রেণু খুলিয়া দেখিছে অস্ফুট কলিকায়!
বাদলের জলে নাহিয়া সে মেয়ে হেসে কুটি কুটি হয়,
সে হাসি তাহার অধর নিঙাড়ি লুটাইছে বনময়।
কাননের পথে লহর খেলিছে অবিরাম জল-ধারা
তারি স্রোতে আজি শুকনো পাতারা ছুটিয়াছে ঘরছাড়া!
হিজলের বন ফুলের আখরে লিখিয়া রঙিন চিঠি,
নিরালা বাদলে ভাসায়ে দিয়েছে না জানি সে কোন দিঠি!
চিঠির উপরে চিঠি ভেসে যায় জনহীন বন বাটে,
না জানি তাহারা ভিড়িবে যাইয়া কার কেয়া-বন ঘাটে!
কোন্ সে বিরল বুনো ঝাউ শাখে বুনিয়া গোলাপী শাড়ী, -
হয়ত আজিও চেয়ে আছে পথে কানন-কুমার তারি!
দিকে দিগেনে- যতদূর চাহি, পাংশু মেঘের জাল
পায়ে জড়াইয়া পথে দাঁড়ায়েছে আজিকার মহাকাল।
গাঁয়ের চাষীরা মিলিয়াছে আসি মোড়লের দলিজায়, -
গল্পের গানে কি জাগাইতে চাহে আজিকার দিনটায়!
কেউ বসে বসে বাখারী চাঁচিছে, কেউ পাকাইছে রসি,
কেউবা নতুন দোয়াড়ীর গায়ে চাঁকা বাঁধে কসি কসি।
কেউ তুলিতেছে বাঁশের লাঠিতে সুন্দর করে ফুল
কেউবা গড়িছে সারিন্দা এক কাঠ কেটে নির্ভুল।
মাঝখানে বসে গাঁয়ের বৃদ্ধ, করুণ ভাটীর সুরে,
আমীর সাধুর কাহিনী কহিছে সারাটি দলিজা জুড়ে।
লাঠির উপরে, ফুলের উপরে আঁকা হইতেছে ফুল,
কঠিন কাঠ সে সারিন্দা হয়ে বাজিতেছে নির্ভুল।
তারি সাথে সাথে গল্প চলেছে- আমীর সাধুর নাও,
বহুদেশ ঘুরে আজিকে আবার ফিরিয়াছে নিজ গাঁও।
ডাব্বা হুঁকাও চলিয়াছে ছুটি এর হতে ওর হাতে,
নানান রকম রসি বুনানও হইতেছে তার সাথে।
বাহিরে নাচিছে ঝর ঝর জল, গুরু গুরু মেঘ ডাকে,
এ সবের মাঝে রূপ-কথা যেন আর রূপকথা আঁকে!
যেন ও বৃদ্ধ, গাঁয়ের চাষীরা, আর ওই রূপ-কথা,
বাদলের সাথে মিশিয়া গড়িছে আরেক কল্প-লতা।
বউদের আজ কোনো কাজ নাই, বেড়ায় বাঁধিয়া রসি,
সমুদ্রকলি শিকা বুনাইয়া নীরবে দেখিছে বসি।
কেউবা রঙিন কাঁথায় মেলিয়া বুকের স্বপনখানি,
তারে ভাষা দেয় দীঘল সূতার মায়াবী নকসা টানি।
বৈদেশী কোন্ বন্ধুর লাগি মন তার কেঁদে ফেরে,
মিঠে-সুরি-গান কাঁপিয়ে রঙিন ঠোঁটের বাঁধন ছেঁড়ে।
আজিকে বাহিরে শুধু ক্রন্দন ছল ছল জলধারে,
বেণু-বনে বায়ু নাড়ে এলোকেশ, মন যেন চায় কারে।


রবিবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৭

ভূপেন্দ্র কুমার দত্ত


    ভূপেন্দ্র কুমার দত্ত


    শেয়ার করেছেন                                প্রণব কুমার কুণ্ডু।

স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং অগ্নিযুগের বিপ্লবী
ভূপেন্দ্র কুমার দত্ত (জন্মঃ- ৮ অক্টোবর, ১৮৯৪ - মৃত্যুঃ- ২৯ ডিসেম্বর, ১৯৭৯)

১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তিনি বিপ্লবী দলের অন্যতম নেতারূপে জার্মাণ অস্ত্রের সাহায্যে ভারতে অভ্যুত্থান ঘটানোর জন্য আত্মনিয়োগ করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ১৯১৭ সালে তিনি ধরা পড়ে যান। ঐ বছরের শেষে ভারত সচিব মন্টেগু সাহেব ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিচার বিবেচনা করার জন্য আগমন করলে রাজবন্দীরা একযোগে অনশন ধর্মঘট করেন। তখন ভূপেন্দ্র কুমার বিলাশপুরে প্রেরিত হয়েছিলেন। সেখানে আটাত্তর দিন নিঃসঙ্গ অবস্থায় অনশন করেন। তাকে দেশের মধ্যে রাখা বিপজ্জনক মনে করে কিছুদিনের মধ্যে তাকে বার্মার ইনসিন জেলে স্থানান্তরিত করা হয়। ১৯২০ সালে ছাড়া পাবার পরে দলের সিদ্ধান্ত অনুসারে গান্ধীজির অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেন। সংগঠনের ভিত্তি দৃঢ় ও প্রসারিত করার উদ্দেশ্যে বিপ্লবী কিরণ মুখার্জীর সঙ্গে দৌলতপুরে সত্যাশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। খুলনা সেনহাটের রবি রায় ও রসিক দাস এবং সেই সাথে চারু ঘোষ, কুন্তল চক্রবর্তী প্রমুখেরা সেই আশ্রমে যোগ দেন।
১৯২৩ সালে আবার তারা গ্রেফতার হন। ৫বছর পরে ১৯২৮ সালে মুক্তি পান। মুক্তি পাওয়ার পরে সবাই কলকাতা কংগ্রেসের বিরাট অনুষ্ঠানে যোগদান করেন। ১৯৩০ এর এপ্রিলে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের সাথে সাথে পুলিশ তৎপর হয়ে ওঠে এবং অন্যান্যদের সাথে ভূপেন্দ্র কুমার দত্তকে,  রাজশাহী কনফারেন্স থেকে ফেরার পথে গ্রেফতার করে। আবার দীর্ঘ আট বছর কারাবাসের পর ১৯৩৮ সালে মুক্তি পান। পুনরায় ১৯৪২ সালে ভারত ছাড় আন্দোলনের সময় ধরা পড়েন এবং ১৯৪৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত কারাবাস করেন।

পাকিস্তানে অতিবাহিত সময়
দেশ বিভাগের পরে পূর্ব পাকিস্তানে বাস করেন। দেশে এম.এল.এ ও পরে এম.পি হন। কিন্তু দেশে থাকা তার পক্ষে বেশীদিন আর সম্ভব হয়নি। কলকাতায় চলে যান।
ভারতে ফিরে আসা
কংগ্রেসের কাজে ও পড়াশুনা নিয়ে জীবনের শেষ কয়েকটি দিন কাটিয়ে দেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো যে, বৃটিশ সরকার তার বিরুদ্ধে কখনো কোন মামলা দায়ের করেনি। তবু তাকে জীবনের ২৫ বছর বিনা বিচারে জেল খানায় কাটাতে হয়। কারণ বৃটিশ সরকার তাকে ভয়ঙ্কর বিপদজনক মনে করে বাইরে রাখতে ভয় পেত। 
এক সময় তিনি সাপ্তাহিক স্বাধীনতা পত্রিকা সম্পাদনা করেন।
জন্ম
তিনি বাংলাদেশের যশোর জেলার ঠাকুরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা কৈলাশ চন্দ্র দত্ত পার্শ্ববর্তী ফরিদপুর জেলার ম্যানেজার ছিলেন। তার মাতা বিমলাসুন্দরী একজন দানশীল মহিলা ছিলেন। কমলিনী, যদুগোপাল, স্নেহলতা, সুপ্রভা নামে তার চার সহদোর ছিল।
একবার রামায়ণ পড়ার সময় সে লক্ষণের বীরত্বের কাহিনী জানতে পারে এবং ব্রহ্মচর্যে তার দখল সম্পর্কে পড়ে। এরপরে সে তার মার কাছ থেকে ব্রহ্মচর্য সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে,  নিজে সেই পথ অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত নেন। ফরিদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে থাকাকালীন সময়ে তিনি অনুশীলন সমিতিতে যোগ দেন এবং পরবর্তীতে  বিভিন্ন মানবিক কার্যক্রম এবং ১৯০৫ সালের দেশ বিভাগের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। 
উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য প্রথমে কলকাতায় স্কটিশ চার্চ কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু ১৯১৩ সালে দৌলতপুর হিন্দু একাডেমী কলেজ (পরবর্তীতে বি এল কলেজ)-এ চলে আসেন। এখানেই দেশ প্রেমিক অধ্যাপক শশীভূষণ রায় তাকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করেন। ভূপেন্দ্র কুমার শরীরচর্চা এবং নানা রকম সেবা মূলক কাজের মাধ্যমে নিজেকে অত্যান্ত জনপ্রিয় করে তোলেন। শীঘ্রই তিনি বিপ্লবী দল গঠনে তৎপর হন। ঐ সময় বাঘা যতীন যশোর-ঝিনাইদহ রেললাইন নির্মাণের ঠিকাদারী কর্মসূত্রে যশোরে থাকার সময় মাঝে মাঝে তার বন্ধু দৌলতপুর কলেজের অধ্যাপক শশীভূষণ রায় ও শৈলেন মৌলিকদের সাথে দেখা করতে আসতেন। সেই সময় তার সাথে ভূপেন্দ্রের পরিচয় হয়। ঐ আমলে বিপ্লবী দলভূক্ত সতীশ সেনগুপ্ত অধ্যাপক হিসাবে এবং যশোর বনগাঁ নিবাসী ডাঃ অমুল্য চরণ উকিল ডাক্তার হিসাবে এই কলেজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
ইতহিাসে তার অবদান
তার আত্মজীবনী মূলক লেখা -বিপ্লবের পদচিহ্ন।
Indian Revolution and the Constructive Programme