বুধবার, ৩ জানুয়ারি, ২০১৮

গাংনাপুরের দেবগ্রাম


   গাংনাপুরের দেবগ্রাম

   শেয়ার করেছেন                                   প্রণব কুমার কুণ্ডু।

সমাজ বিবর্তন ও পুরাতত্ত্বের আলোকে নদীয়া জেলার এক বিলুপ্ত জনপদ-- দেবল রাজার গড় বা দেবগ্রাম।
একটি অদ্ভুত কিন্তু অবহেলিত জায়গা হচ্ছে দেবগ্রাম, জীবন্ত প্রত্নক্ষেত্র বলা যায়।এখানে ধানজমিতে চাষ করতে গেলে, লাঙ্গলের ডগায় উঠে আসে কোন সেই প্রাচীন, সম্ভবত পাল যুগের মূর্তি বা জলপ্রদীপ, সেন যুগের ঘর গেরস্থালির হাঁড়ি- কুঁড়ি অথবা সুলতানি আমলের সুরাপাত্র, হুঁকো, কলসি ইত্যাদি।মাটির সামান্য নিচেই অসংখ্য মৃৎপাত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নল পুকুর, বিল পাড়া, পন্ডে পাড়া প্রভৃতি অঞ্চলে।এইসব জায়গায় রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে মাড়িয়ে যেতে হয় হাজার বছরের প্রাচীন ঐতিহাসিক সামগ্রী।পুকুর খুঁড়লে বেরিয়ে আসে বিশাল বিশাল পাথরের ব্লক, প্রাচীন ইট, সে ইট বিভিন্ন প্রকারের, ছোট থেকে শীল পাটার চেয়েও বড়।
এখানকার চাষিরা, জনমজুরেরা, সাধারণ মানুষেরা, বুঝে উঠতে পারছেন না,  এই যে জিনিসগুলি উঠে আসছে, সেগুলি নিয়ে কি করবে তাঁরা।কিন্তু এটুকু তাঁরা খুব ভালো করে বুঝতে পারছেন, এসব জিনিষ অতি প্রাচীন, যতক্ষণ না সরকার বা কোনো বিশ্ববিদ্যালয় অধিগ্রহণ করছে, ততদিন এদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
শুনলে আশ্চর্য হবেন,  গ্রামের মানুষেরা নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে একটা আস্ত প্রত্নতাত্ত্বিক সংগ্রহশালা বানিয়ে ফেলেছেন।এদের সঙ্গে আছেন কয়েকজন উৎসাহী তরুণ ও যুবক যেমন ডা: বিশ্বজিৎ রায়, সঞ্জয় ভৌমিক, অনির্বান বসু, দেবজিৎ বিশ্বাস ইত্যাদি।
প্রতিদিনই কেউ না কেউ, কিছু না কিছু জিনিষ দিয়ে যাচ্ছে, এতে করে সংগ্রহশালায় আর নতুন করে কিছু রাখার স্থান অকুলান হয়ে গেছে।
সমগ্র দেবগ্রামবাসীরা অতিশয় উৎসাহী এই ঐতিহাসিক সম্পদ গুলি বাঁচাতে, কিন্তু বিদ্যোৎসাহী পন্ডিতেরা এবং পুরাতাত্ত্বিক কর্তৃপক্ষ এগিয়ে না এলে এভাবে বেশিদিন চলতে পারে না।দরকার বিজ্ঞান সম্মত খনন, সংরক্ষণ এবং বিশেষজ্ঞের মতামত।
এখানে পৌঁছাতে গেলে, সরাসরি চাকদহ বা রানাঘাট স্টেশনে এসে নেমে, যাওয়া যায়।ডা: বিশ্বজিৎ রায়-এর ব্যক্তিগত ভাবে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছেন , দেবগ্রাম নিয়ে অবহিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।আশায় রইলাম দেবগ্রামে একদিন চন্দ্র কেতুগরের মতন কর্মকান্ড শুরু হবে।
এখানে চাষিরা জমির মধ্যে যেসব জিনিষ পেয়েছেন, তার গুটিকয়েক ছবি তুলে ধরছি।এগুলি তাঁদের সংগ্রহশালায় রাখা আছে।
এই দেবগ্রাম, গাংনাপুর-এর দেবগ্রাম ! পলাশী'র আগের দেবগ্রাম নয় !



INQUILAB ZINDABAD


INQUILAB  ZINDABAD

Shared by                                Pranab Kumar Kundu.






India remembers Maulana Hasrat Mohani who gave the revolutionary slogan 'Inquilab Zindabad' !

This great freedom fighter, also a noted Urdu poet, gave the revolutionary slogan 'Inquilab Zindabad' during the country's freedom struggle in 1921.

By Zee Media Bureau | Updated: Jan 02, 2017, 17:56 PM IST

Comments | 
India remembers Maulana Hasrat Mohani who gave the revolutionary slogan "Inquilab Zindabad" !

New Delhi: Fans and followers of veteran freedom fighter and noted Urdu poet Maulana Hasrat Mohani paid rich tribute on his birth anniversary on Sunday.

Hasrat Mohani was born in 1875 in Unnao in Uttar Pradesh.

This great freedom fighter, also a noted Urdu poet, gave the revolutionary slogan 'Inquilab Zindabad' during the country's freedom struggle in 1921.

Hasrat Mohani, whose real name was Syed Fazl-ul-Hasan, was a versatile Urdu poet who had penned many remarkable poems with the pen name Hasrat Mohani.

He had immense love and devotion for Lord Krishna which reflected in his verses. He had also frequently visited Mathura to celebrate Krishna Janmashtami.

Today Freedom Fighter Maulana Hasrat Mohani Was Born In 1875 In Unnao ,Uttar Pradesh. He Gave The Revolutionary Slogan 'Inquilab Zindabad' !



Hasrat Mohani, who studied at Aligarh Muslim University, had joined the freedom struggle with Bal Gangadhar Lokmanya Tilak.

Some of his literary works included “Kulliyat-e-Hasrat Mohani”, “Sharh-e-Kalam-e-Ghalib”, “Nukaat-e-Sukhan” and “Mushahidaat-e-Zindaan”.

He had also penned the popular ghazal song “Chupke Chupke Raat Din” sung by Ghulam Ali and Jagjit Singh.

Hasrat Mohani was jailed for many years by the British authorities for participating in the Indian struggle movement.

Maulana Hasrat Mohani died on 13 May 1951 in Lucknow.

মঙ্গলবার, ২ জানুয়ারি, ২০১৮

ইংরেজি ক্যালেন্ডারের কথা


    ইংরেজি ক্যালেন্ডারের কথা

    শেয়ার করেছেন              প্রণব কুমার কুণ্ডু

যিশুখ্রিস্ট যদি বেঁচে থাকতেন, তাহলে আজ তার বয়স হত ২০১৮ বছর।
অন্তত, অর্থানুসারে তাই হওয়া উচিৎ। খ্রিস্ট জন্ম থেকেই তো খ্রিস্টাব্দ। কিন্তু তাহলে তো যিশুর জন্ম পয়লা জানুআরি হওয়া উচিৎ। সে তো নয়, আমরা তো পঁচিশে ডিসেম্বর.......
মাঝখানের ছ’ছটা দিন কোথায় গায়েব হয়ে গেল?
ছোটবেলায় প্রশ্নটা আমাকে ভাবাত খুব। আর তখন তো হাতের কাছে সবজান্তা গুগল ছিল না। যাই হোক, পরবর্তীতে এই নিয়ে ঘাঁটাঘাটি করে যা পেলাম, তাতে তো আরও চমকে চুয়াল্লিশ। জন্ম তারিখের কথা বাদ দিন, গবেষকরা বলছেন, যিশুর জন্ম চার খ্রিস্টপূর্বাব্দে। বুঝুন ঠ্যালা! যিশুর জন্ম নাকি যিশুর জন্মের চার বছর আগেই!
তাহলে আসুন, এই বিষয়ে যা পড়াশুনা করেছি তারই নির্যাসের এই লেখা, শোনাই খ্রিস্টাব্দের ইতিকথা।
প্রথমে আসি, বারোটি মাসের নামকরণ বিষয়ে।
সেপ্টেম্বর কথাটি এসেছে সংস্কৃত ‘সপ্তম’ বা ল্যাটিন ‘সেপ্টেম’ থেকে।
রে রে করার কিছু নেই; ল্যাটিন ভাষা তথা সমস্ত ইয়োরোপিয় ভাষার জন্ম সংস্কৃত থেকেই।
তেমনি, অক্টোবর এসেছে, অষ্টম বা অক্টা থেকে, নবম বা নভেম থেকে নভেম্বর, দশম বা ডিসেম থেকে ডিসেম্বর।
জানি ভাবছেন, সেপ্টেম্বর তো সপ্তম মাস নয়, নবম মাস, তেমনি অক্টোবর, নভেম্বর, ডিসেম্বরও যথাক্রমে দশম, একাদশ আর দ্বাদশ। আরে দাদা, দিদিরা, রসুন (গার্লিক না কিন্তু)।
বিদ্যা বুদ্ধিতে, শক্তিতে, সে সময় রোম সাম্রাজ্যের খুব নামডাক ছিল। এই রোমানরা একপ্রকার ক্যালেন্ডার ব্যবহার করত। সম্ভবত রোমান সম্রাট রোমুলাস ৭৩৮ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে এই ক্যালেন্ডার চালু করেন। এতে থাকত দশটি মাস, যার শুরু, মার্চ মাসে, আর শেষ ডিসেম্বরে। সেই হিসাবে দাদা দিদিরা, সাতে সেপ্টেম্বর, আটে অক্টোবর, নয়ে নভেম্বর আর দশে ডিসেম্বর।
ছয়ে ছিল সেক্সটিলিস, আর পাঁচে কুইন্টিলিস, যে দুটো মাসকে এখন আমরা অগাস্ট, আর জুলাই নামে চিনি।
জুন মাসের নামকরণ হয়েছে রোমান দেবতা জুপিটারের স্ত্রী জুনোর নামে, মে হয়েছে ‘মেইয়া’, এপ্রিল ‘আফ্রেদিৎ’ আর মার্চ যুদ্ধের দেবতা মার্সের নামে।
দশ মাসের বছরে ছিল মোট তিনশ চার দিন। স্বভাবতই এই ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে চাষবাস, পালাপার্বণ কিছুই ঠিকমতো করা যেত না। তার ওপর, রাজা মহারাজারা ইচ্ছাখুশি ক্যালেন্ডারে দিন-টিন বাড়িয়ে কমিয়ে দিতেন।
পরবর্তী কালে সম্রাট নুমা এর সঙ্গে আরও দুটি মাস জানুআরি, আর ফেব্রুআরি যোগ করেন। বাইশ দিনের একটি তেরোতম মাসও সে সময় ক্যালেন্ডারে এসেছিল, যেটি এক বছর অন্তর অন্তর ক্যালেন্ডারে জায়গা পেত। মাসটির নাম ছিল মার্সিডানাস।
মিশরিয়রা সে সময় জ্যোতির্বিদ্যায় অনেকখানি পারঙ্গম হয়ে উঠেছিল। আটচল্লিশ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার মিশর থেকে একটি ক্যালেন্ডার আমদানি করেন, ও পরিমার্জন করে রাজ্যে তিনশ সাড়ে পঁয়ষট্টি দিনে সৌরবৎসর, এরকম ক্যালেন্ডার চালু করেন, আর জানুআরি, আর ফেব্রুআরি, এই দুটি মাসকে বছরের শুরুতে নিয়ে আসেন।
শুরুতে ফেব্রুআরি মাস ত্রিশ দিনেরই ছিল। কুইন্টিলিসও ছিল ত্রিশ দিনের মাস, জুলিয়াস সিজার তার জন্মমাস কুইন্টিলিস এর নাম পরবর্তন করে জুলাই করেন। কিন্তু রাজার নামে মাস; অন্য মাসের চেয়ে ছোট হয় কী করে? তাই ফেব্রুআরি থেকে এক দিন কেটে জুলাই মাসটি একত্রিশ দিনের করেন।
জুলিয়াস সিজারের পরবর্তী রোমান সম্রাট সিজার অগাস্টাস সেক্সটিলিস মাসটির নাম পরিবর্তন করে অগাস্ট করেন; এবং এবারও একই ভাবে বেচারা ফেব্রুআরির আরেকটি দিন কাটা যায়।
জুলিয়াস সিজারের নামে এই ক্যালেন্ডার ‘জুলিয়ান ক্যালেন্ডার’ নামে পরিচিত হয়, কিন্তু তখন খ্রিস্টই নেই; তাই খ্রিস্টাব্দও নেই।
সময়ের হিসাবে ৫২৫ খ্রিস্টাব্দে, তখন বাইজানটিয়াম শাসকদের অব্দ প্রচলিত ছিল, যারা কি না বহু খ্রিশ্চান নিধনের সঙ্গে যুক্ত, সে সময় পোপ ডাইনোসিস এক্সিগুয়াস হিসাব নিকাশ করে একেবারে ৫২৫ AD চালু করেন।
২১ শে মার্চ মহাবিষুব, তার চার দিন পর, অর্থাৎ ২৫ শে মার্চ খ্রিস্টানদের একটি অতি পবিত্র দিন। ওই দিন গ্যাব্রিয়েল মেরিকে দর্শন দিয়ে যিশুর আগমনের সুসমাচার দিয়েছিল। আর ২১ শে মার্চ থেকে নয় মাস পরে অর্থাৎ ২৫শে ডিসেম্বর দিনটিকে যিশুর জন্মদিন ধরা হয়।
ত্রয়োদশ শতাব্দীতে পোপ গ্রেগরি লক্ষ করলেন, জুলিয়ান ক্যালেন্ডারে মহাবিষুবের তারিখ হচ্ছে ১০ই মার্চ, অর্থাৎ জুলিয়ান ক্যালেন্ডার ১১ দিন পিছিয়ে পড়েছে। তিনিই জ্যোতির্বিদের সঙ্গে পরামর্শ করে ক্যালেন্ডারে ১১ দিন যোগ করেন, লিপ ইয়ারের নিয়ম চালু করেন।
১৭৫২ খ্রিস্টাব্দে ইংলন্ড আইন করে জুলিয়ান ক্যালেন্ডার বাতিল করে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার গ্রহণ করে। পরে পৃথিবীর প্রায় সমস্ত দেশই এই ক্যালেন্ডার মেনে চলতে শুরু করে।
ইস্টান অর্থোডক্সিয়ানরা গ্রেগরের এই সংস্কার মানে নি। তাই ওরা ২৫শে ডিসেম্বরের সঙ্গে ১১ দিন যোগ করে ৬ই জানুআরি বড়দিন পালন করেন। বর্তমানে আর্মেনিয়াতে ও আরও কয়েকটি দেশে ৬ই জানুআরি বড়দিন।
রাশিয়া অনেক পরে, (১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে রুশ বিপ্লবের পরে) গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার গ্রহণ করে। ১৯০৮ সালে লন্ডন অলিম্পিকে রাশিয়ান দল ১১ দিন পরে পৌঁছায়।
অনেক কথাই বাকি থেকে গেল। পরে হবে। ভালো থাকুন। ২০১৮ শুভ হোক।
লিখেছেন বিরাজ মুখার্জি।


আরও প্র

সোমবার, ১ জানুয়ারি, ২০১৮

জসীম উদ্দীন


জসীম উদ্দীন

শেয়ার করেছেন                        প্রণব কুমার কুণ্ডু।

পল্লী কবি
জসীম উদ্ দীন (জন্মঃ- ১ জানুয়ারি, ১৯০৩ - মৃত্যুঃ- ১৩ মার্চ, ১৯৭৬)
তিনি বাংলায় 'পল্লী কবি' হিসেবে পরিচিত। তাঁর লেখা কবর কবিতাটি বাংলা সাহিত্যে এক অবিস্মরণীয় অবদান। নকশী কাঁথার মাঠ কবির শ্রেষ্ঠ রচনা যা বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। নকশী কাঁথার মাঠ ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত বাংলা সাহিত্যের একটি অনবদ্য আখ্যানকাব্য। বাংলা কবিতার জগতে যখন ইউরোপীয় ধাঁচের আধুনিকতার আন্দোলন চলছিল তখন প্রকাশিত এই কাব্যকাহিনী ঐতিহ্যগত ধারার শক্তিমত্তাকে পুনঃপ্রতিপন্ন করে। এটি জসীমউদ্দীনের একটি অমর সৃষ্টি হিসাবে বিবেচিত। কাব্যগ্রন্থটি ইংরেজিতে অনূদিত হয়ে বিশ্বপাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিল।
প্রাথমিক জীবন
তিনি ফরিদপুর জেলার তাম্বুলখানা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার বাড়ি ছিলো একই জেলার গোবিন্দপুর গ্রামে। বাবার নাম আনসার উদ্দিন মোল্লা। তিনি পেশায় একজন স্কুল শিক্ষক ছিলেন। মা আমিনা খাতুন ওরফে রাঙাছুট। জসীম উদ্ দীন ফরিদপুর ওয়েলফেয়ার স্কুল, ও পরবর্তীতে ফরিদপুর জেলা স্কুল থেকে পড়ালেখা করেন। এখান থেকে তিনি তার প্রবেশিকা পরীক্ষায় ১৯২১ সনে উত্তীর্ণ হন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি. এ. এবং এম. এ. শেষ করেন যথাক্রমে ১৯২৯ এবং ১৯৩১ সনে। ১৯৩৩ সনে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. দীনেশ চন্দ্র সেনের অধীনে রামতনু লাহিড়ী গবেষণা সহকারী পদে যোগ দেন। এরপর ১৯৩৮ সনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন।
১৯৬৯ সনে রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কবিকে সম্মান সূচক ডি লিট উপাধিতে ভূষিত করেন। তিনি ১৩ মার্চ ১৯৭৬ সনে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। পরে তাকে তাঁর নিজ গ্রাম গোবিন্দপুরে সমাধিস্থ করা হয়।
গ্রন্থাবলী
কাব্যগ্রন্থ
রাখালী (১৯২৭)
নকশী কাঁথার মাঠ (১৯২৯)
বালু চর (১৯৩০)
ধানখেত (১৯৩৩)
সোজন বাদিয়ার ঘাট (১৯৩৪)
হাসু (১৯৩৮)
রঙিলা নায়ের মাঝি(১৯৩৫)
রুপবতি (১৯৪৬)
মাটির কান্না (১৯৫১)
এক পয়সার বাঁশী (১৯৫৬)
সকিনা (১৯৫৯)
সুচয়নী (১৯৬১)
ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে (১৯৬২)
মা যে জননী কান্দে (১৯৬৩)
হলুদ বরণী (১৯৬৬)
জলে লেখন (১৯৬৯)
কাফনের মিছিল ((১৯৮৮)
নাটক
পদ্মাপার (১৯৫০)
বেদের মেয়ে (১৯৫১)
মধুমালা (১৯৫১)
পল্লীবধূ (১৯৫৬)
গ্রামের মেয়ে (১৯৫৯)
ওগো পুস্পধনু (১৯৬৮)
আসমান সিংহ (১৯৮৬)
আত্মকথা
যাদের দেখেছি ((১৯৫১)
ঠাকুর বাড়ির আঙ্গিনায় (১৯৬১)
জীবন কথা ( ১৯৬৪)
স্মৃতিপট (১৯৬৪)
উপন্যাস
বোবা কাহিনী (১৯৬৪)
ভ্রমণ কাহিনী
চলে মুসাফির (১৯৫২)
হলদে পরির দেশে ( ১৯৬৭)
যে দেশে মানুষ বড় (১৯৬৮)
জার্মানীর শহরে বন্দরে (১৯৭৫)
সঙ্গীত
জারি গান (১৯৬৮)
মুর্শিদী গান (১৯৭৭)
অন্যান্য
বাঙালির হাসির গল্প
ডালিমকুমার (১৯৮৬)
পুরস্কার
প্রেসিডেন্টস এওয়ার্ড ফর প্রাইড অফ পারফরমেন্স ১৯৫৮
একুশে পদক ১৯৭৬
স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার ১৯৭৮ (মরণোত্তর)
১৯৭৪ সনে তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন।
রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি. লিট ডিগ্রি (১৯৬৯)
নকশী কাঁথার মাঠ ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত বাংলা সাহিত্যের একটি অনবদ্য আখ্যানকাব্য। বাংলা ভাষায় রচিত এই আখ্যানকাব্যের লেখক বাংলাদেশের পল্লীকবি জসীমউদ্দীন। বাংলা কবিতার জগতে যখন ইউরোপীয় ধাঁচের আধুনিকতার আন্দোলন চলছিল তখন প্রকাশিত এই কাব্যকাহিনী ঐতিহ্যগত ধারার শক্তিমত্তাকে পুন:প্রতিপন্ন করে। এটি জসীমউদ্দীনের একটি অমর সৃষ্টি হিসাবে বিবেচিত। কাব্যগ্রন্থটি ইংরেজিতে অনূদিত হয়ে বিশ্বপাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিল। নকশী কাঁথার মাঠ কাব্যোপন্যাসটি রূপাই ও সাজু নামক দুই গ্রামীণ যুবক-যুবতীর অবিনশ্বর প্রেমের করুণ কাহিনী কাহিনী। এই দুজনই ছিলেন বাস্তব চরিত্র।
কাহিনী সংক্ষেপ
নকশী কাঁথার মাঠ-এর নায়ক রূপাই গাঁয়ের ছেলে, কৃষ্ণকায়, কাঁধ পর্যন্ত চুল। তার কতগুলো গুণ আছে: সে ভালো ঘর ছাইতে জানে, যে হাত দিয়ে সে সুন্দর ঘর ছায়, সেই হাতেই লড়কি চালাতে জানে, সড়কি চালাতে জানে, আবার বাঁশের বাঁশিতে তার মতো আড় আর কেউ দিতে পারে না, এমনকি তার মতো আর কেউ গান গাইতেও পারে না। এই রূপাইয়ের সঙ্গে পাশের গ্রামের মেয়ে সাজুর ভালোবাসা হয়, আর তারপর হয় বিয়ে। তারা সুখের সংসার পাতে। একদিন গভীর রাতে চাঁদ ওঠে, গোবর নিকানো আঙিনায় মাদুর পেতে সাজু রূপাইয়ের কোলে শুয়ে রয়, তাই একসময় বাঁশির বাজনা থেমে যায়। কারণ যাকে শোনানোর জন্য রূপাই এতদিন বাঁশি বাজিয়েছে, সেই মানুষটি এখন তারই ঘরে। সেদিন রাতের পূর্ণিমার আলোতে সাজুর রূপ দেখে দারুণ মুগ্ধ হয় রূপাই, কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে কী যেন এক সংশয় জেগে ওঠে। সে ভাবে, এত সুখ আমার সইবে তো! এক অজানা আশঙ্কায় তার অন্তরের বেদনাশ্রু সাজুর কোমল মুখের ওপর পড়ে, সাজুর ঘুম ভেঙে যায়, স্বামীর চোখে জলের ধারা দেখে সাজু বলে, তুমি কাঁদছ কেন? তোমাকে তো আমি কোনো আঘাত দিইনি। রূপাই বলে, এক অজানা আশঙ্কায় কাঁদছি। সাজু বলে, না না, আমরা তো কোনো অন্যায় করিনি। এমন সময় হঠাৎ খবর আসে, বনগেঁয়োরা তাদের গাজনা-চরের পাকা ধান কেটে নিয়ে যাচ্ছে। রূপাই ছুটে যায় লড়কি-সড়কি হাতে বনগেঁয়োদের প্রতিরোধ করতে। সেখানে লড়াই হয় (স্থানীয় ভাষায় কাইজ্জা), কয়েকটি খুন হয় এবং ফলশ্রুতিতে রূপাই ফেরারি হয়ে যায়। আর সাজু রোজ একটা পিদিম বা মাটির প্রদীপ জ্বালিয়ে বসে থাকে রূপাইয়ের পথ চেয়ে। একটা মরা পাতা ঝরে পড়লেও রূপাই-বিরহিণী সাজু, পাতার শব্দ লক্ষ করে আলোটা নিয়ে ছুটে যায়, কোথায় রূপাই? দিন চলে যায়। একদিন গভীর রাতে রূপাই এসে দাঁড়ায় সাজুর সামনে। সাজু দেখে, রূপাইয়ের সারা গায়ে মাটি মাখা, রক্তের দাগও লেগে আছে কোথাও কোথাও। সাজু তাকে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘তোমাকে আর যেতে দেবো না।’ রূপাই বলেছে, ‘আমার না যেয়ে উপায় নেই, যেতেই হবে। কেননা, আমি যদি ধরা পড়ি, আমার ফাঁসি অথবা কালাপানি হবে।’ সাজু এখানে বলেছিল, ‘তুমি তো চলে যাবে আমাকে কার কাছে তুমি রেখে যাবে’, তখন রূপাই বলে,
“ সখী দীন দুঃখীর যারে ছাড়া কেহ নাই
সেই আল্লার হাতে আজি আমি তোমারে সঁপিয়া যাই।
মাকড়ের আঁশে হস্তী যে বাঁধে, পাথর ভাসায় জলে
তোমারে আজিকে সঁপিয়া গেলাম তাঁহার চরণতলে। ”
ইহলোকে রূপাইয়ের সঙ্গে সাজুর এই ছিল শেষ দেখা। সাজু আর কী করবে, সেই প্রথম দেখা ও বৃষ্টির জন্য কুলা নামানোর দিনের দৃষ্টি বিনিময় থেকে শুরু করে তাদের জীবনের সব কথাকে এমনকি যে রাতে রূপাই জন্মের মতো চলে গেল, এসব অতীত স্মৃতি কাঁথার ওপর ফুটিয়ে তুলতে লাগলো সুঁই-সুতা দিয়ে। যেদিন সেই কাঁথা বোনা শেষ হয়ে গেলো, সাজু তার মায়ের কাছে দিয়ে বললো, ‘মা, আমার মরণের পরে যেখানে কবর দেওয়া হবে, সেই কবরের ওপরে যেন এই নকশী কাঁথাখানা বিছিয়ে দেওয়া হয়। আর যদি কোনোদিন রূপাই এসে আমার খোঁজ করে, তাকে বোলো, তোমার আশায় সাজু ওই কবরের নিচে আছে।’
বহুদিন পরে গাঁয়ের কৃষকেরা গভীর রাতে বেদনার্ত এক বাঁশির সুর শুনতে পায়, আর ভোরে সবাই এসে দেখে, সাজুর কবরের পাশে এক ভিনদেশি লোক মরে পড়ে আছে। কবি জসীমউদ্দীন এই আখ্যানের একেবারে শেষ পর্বে এর করুণ বেদনাকে প্রকাশ করতে লিখেছেন:
“ আজো এই গাঁও অঝোরে চাহিয়া ওই গাঁওটির পানে
নীরবে বসিয়া কোন্ কথা যেন কহিতেছে কানে কানে। ”
শুধু তা-ই নয়, তিনি এ কাহিনীর বেদনাকে বিস্তার করে দিতে আরও লিখেছেন,
“ কেহ কেহ নাকি গভীর রাত্রে দেখেছে মাঠের পরে
মহা-শূন্যেতে উড়াইছে কেবা নকসী কাঁথাটি ধরে
হাতে তার সেই বাঁশের বাঁশিটি বাজায় করুণ সুরে
তারি ঢেউ লাগি এ-গাঁও ওগাঁও গহন ব্যথায় ঝুরে। ”
অনুবাদ
১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে প্রথম প্রকাশের পর এই কাব্যগ্রন্থটি ইংরেজিতে ই. এম. মিলফোর্ড কর্তৃক অনুদিত হয় The Field of Embroidered Quilt নামে।
ফুল নেয়া ভাল নয়
- জসীম উদ্‌দীন
ফুল নেয়া ভাল নয় মেয়ে।
ফুল নিলে ফুল দিতে হয়, -
ফুলের মতন প্রাণ দিতে হয়।
যারা ফুল নিয়ে যায়,
যারা ফুল দিয়ে যায়,
তারা ভুল দিয়ে যায়,
তারা কুল নিয়ে যায়।
তুমি ফুল, মেয়ে! বাতাসে ভাঙিয়া পড়
বাতাসের ভরে দলগুলি নড়নড়।
ফুলের ভার যে পাহাড় বহিতে নারে
দখিনা বাতাস নড়ে উঠে বারে বারে।
ফুলের ভারে যে ধরণী দুলিয়া ওঠে,
ভোমর পাখার আঘাতে মাটিতে লোটে।
সেই ফুল তুমি কেমনে বহিবে তারে,
ফুল তো কখনো ফুলেরে বহিতে নারে।
মামার বাড়ি
- জসীম উদ্‌দীন
আয় ছেলেরা, আয় মেয়েরা,
ফুল তুলিতে যাই
ফুলের মালা গলায় দিয়ে
মামার বাড়ি যাই।
মামার বাড়ি পদ্মপুকুর
গলায় গলায় জল,
এপার হতে ওপার গিয়ে
নাচে ঢেউয়ের দল।
দিনে সেথায় ঘুমিয়ে থাকে
লাল শালুকের ফুল,
রাতের বেলা চাঁদের সনে
হেসে না পায় কূল।
আম-কাঁঠালের বনের ধারে
মামা-বাড়ির ঘর,
আকাশ হতে জোছনা-কুসুম
ঝরে মাথার ‘পর।
রাতের বেলা জোনাক জ্বলে
বাঁশ-বাগানের ছায়,
শিমুল গাছের শাখায় বসে
ভোরের পাখি গায়।
ঝড়ের দিনে মামার দেশে
আম কুড়াতে সুখ
পাকা জামের শাখায় উঠি
রঙিন করি মুখ।
কাঁদি-ভরা খেজুর গাছে
পাকা খেজুর দোলে
ছেলেমেয়ে, আয় ছুটে যাই
মামার দেশে চলে।
পল্লী জননী
- জসীম উদ্‌দীন
রাত থম থম স্তব্ধ, ঘোর-ঘোর-আন্ধার,
নিশ্বাস ফেলি, তাও শোনা যায়, নাই কোথা সাড়া কার।
রুগ্ন ছেলের শিয়রে বিসয়া একেলা জাগিছে মাতা,
করুণ চাহনি ঘুম ঘুম যেন ঢুলিছে চোখের পাতা।
শিয়রের কাছে নিবু নিবু দীপ ঘুরিয়া ঘুরিয়া জ্বলে,
তারি সাথে সাথে বিরহী মায়ের একেলা পরাণ দোলে।
ভন্ ভন্ ভন্ জমাট বেঁধেছে বুনো মশকের গান,
এঁদো ডোবা হতে বহিছে কঠোর পচান পাতার ঘ্রাণ?
ছোট কুঁড়ে ঘর, বেড়ার ফাঁকেতে আসিছে শীতের বায়ু,
শিয়রে বসিয়া মনে মনে মাতা গণিছে ছেলের আয়ু।
ছেলে কয়, “মারে, কত রাত আছে? কখন সকাল হবে,
ভাল যে লাগে না, এমনি করিয়া কেবা শুয়ে থাকে কবে?”
মা কয়“বাছারে ! চুপটি করিয়া ঘুমা ত একটি বার, ”
ছেলে রেগে কয় “ঘুম যে আসে না কি করিব আমি তার ?”
পান্ডুর গালে চুমো খায় মাতা, সারা গায়ে দেয় হাত,
পারে যদি বুকে যত স্নেহ আছে ঢেলে দেয় তারি সাথ।
নামাজের ঘরে মোমবাতি মানে, দরগায় মানে দান,
ছেলেরে তাহার ভাল কোরে দাও, কাঁদে জননীর প্রাণ।
ভাল করে দাও আল্লা রছুল। ভাল কোরে দাও পীর।
কহিতে কহিতে মুখখানি ভাসে বহিয়া নয়ন নীর।
বাঁশবনে বসি ডাকে কানা কুয়ো, রাতের আঁধার ঠেলি,
বাদুড় পাখার বাতাসেতে পড়ে সুপারীর বন হেলি।
চলে বুনোপথে জোনাকী মেয়েরা কুয়াশা কাফন ধরি,
দুর ছাই। কিবা শঙ্কায় মার পরাণ উঠিছে ভরি।
যে কথা ভাবিতে পরাণ শিহরে তাই ভাসে হিয়া কোণে,
বালাই, বালাই, ভালো হবে যাদু মনে মনে জাল বোনে।
ছেলে কয়, “মাগো! পায়ে পড়ি বলো ভাল যদি হই কাল,
করিমের সাথে খেলিবারে গেলে দিবে না ত তুমি গাল?
আচ্ছা মা বলো, এমন হয় না রহিম চাচার ঝাড়া
এখনি আমারে এত রোগ হোতে করিতে পারি ত খাড়া ?”
মা কেবল বসি রুগ্ন ছেলের মুখ পানে আঁখি মেলে,
ভাসা ভাসা তার যত কথা যেন সারা প্রাণ দিয়ে গেলে।
“শোন মা! আমার লাটাই কিন্তু রাখিও যতন করে,
রাখিও ঢ্যাঁপের মোয়া বেঁধে তুমি সাত-নরি শিকা পরে।
খেজুরে-গুড়ের নয়া পাটালিতে হুড়ুমের কোলা ভরে,
ফুলঝুরি সিকা সাজাইয়া রেখো আমার সমুখ পরে।”
ছেলে চুপ করে, মাও ধীরে ধীরে মাথায় বুলায় হাত,
বাহিরেতে নাচে জোনাকী আলোয় থম থম কাল রাত।
রুগ্ন ছেলের শিয়রে বসিয়া কত কথা পড়ে মনে,
কোন দিন সে যে মায়েরে না বলে গিয়াছিল দুর বনে।
সাঁঝ হোয়ে গেল আসেনাকো আই-ঢাই মার প্রাণ,
হঠাৎ শুনিল আসিতেছে ছেলে হর্ষে করিয়া গান।
এক কোঁচ ভরা বেথুল তাহার ঝামুর ঝুমুর বাজে,
ওরে মুখপোড়া কোথা গিয়াছিলি এমনি এ কালি-সাঁঝে?
কত কথা আজ মনে পড়ে মার, গরীবের ঘর তার,
ছোট খাট কত বায়না ছেলের পারে নাই মিটাবার।
আড়ঙের দিনে পুতুল কিনিতে পয়সা জোটেনি তাই,
বলেছে আমরা মুসলমানের আড়ঙ দেখিতে নাই।
করিম যে গেল? রহিম চলিল? এমনি প্রশ্ন-মালা;
উত্তর দিতে দুখিনী মায়ের দ্বিগুণ বাড়িত জ্বালা।
আজও রোগে তার পথ্য জোটেনি, ওষুধ হয়নি আনা,
ঝড়ে কাঁপে যেন নীড়ের পাখিটি জড়ায়ে মায়ের ডানা।
ঘরের চালেতে ভুতুম ডাকিছে, অকল্যাণ এ সুর,
মরণের দুত এল বুঝি হায়। হাঁকে মায়, দুর-দুর।
পচা ডোবা হতে বিরহিনী ডা’ক ডাকিতেছে ঝুরি ঝুরি,
কৃষাণ ছেলেরা কালকে তাহার বাচ্চা করেছে চুরি।
ফেরে ভন্ ভন্ মশা দলে দলে বুড়ো পাতা ঝরে বনে,
ফোঁটায় ফোঁটায় পাতা-চোঁয়া জল গড়াইছে তার সনে।
রুগ্ন ছেলের শিয়রে বসিয়া একেলা জাগিছে মাতা।
সম্মুখে তার ঘোর কুজঝটি মহা-কাল-রাত পাতা।
পার্শ্বে জ্বলিয়া মাটির প্রদীপ বাতাসে জমায় খেলা,
আঁধারের সাথে যুঝিয়া তাহার ফুরায়ে এসেছে তেল।
আমার বাড়ি
- জসীম উদ্‌দীন
আমার বাড়ি যাইও ভোমর,
বসতে দেব পিঁড়ে,
জলপান যে করতে দেব
শালি ধানের চিঁড়ে।
শালি ধানের চিঁড়ে দেব,
বিন্নি ধানের খই,
বাড়ির গাছের কবরী কলা,
গামছা-বাঁধা দই।
আম-কাঁঠালের বনের ধারে
শুয়ো আঁচল পাতি,
গাছের শাখা দুলিয়ে বাতাস
করব সারা রাতি।
চাঁদমুখে তোর চাঁদের চুমো
মাখিয়ে দেব সুখে
তারা ফুলের মালা গাঁথি,
জড়িয়ে দেব বুকে।
গাই দোহনের শব্দ শুনি
জেগো সকাল বেলা,
সারাটা দিন তোমায় লয়ে
করব আমি খেলা।
আমার বাড়ি ডালিম গাছে
ডালিম ফুলের হাসি,
কাজলা দীঘির কাজল জলে
কাঁসগুলি যায় ভাসি।
আমার বাড়ি যাইও ভোমর,
এই বরাবর পথ,
মৌরী ফুলের গন্ধ শুঁকে
থামিও তব রথ।
পল্লী-বর্ষা
- জসীম উদ্‌দীন---ধান ক্ষেত
আজিকের রোদ ঘুমায়ে পড়িয়া ঘোলাট-মেঘের আড়ে,
কেয়া-বন পথে স্বপন বুনিছে ছল ছল জল-ধারে।
কাহার ঝিয়ারী কদম্ব-শাখে নিঝ্ঝুম নিরালায়,
ছোট ছোট রেণু খুলিয়া দেখিছে অস্ফুট কলিকায়!
বাদলের জলে নাহিয়া সে মেয়ে হেসে কুটি কুটি হয়,
সে হাসি তাহার অধর নিঙাড়ি লুটাইছে বনময়।
কাননের পথে লহর খেলিছে অবিরাম জল-ধারা
তারি স্রোতে আজি শুকনো পাতারা ছুটিয়াছে ঘরছাড়া!
হিজলের বন ফুলের আখরে লিখিয়া রঙিন চিঠি,
নিরালা বাদলে ভাসায়ে দিয়েছে না জানি সে কোন দিঠি!
চিঠির উপরে চিঠি ভেসে যায় জনহীন বন বাটে,
না জানি তাহারা ভিড়িবে যাইয়া কার কেয়া-বন ঘাটে!
কোন্ সে বিরল বুনো ঝাউ শাখে বুনিয়া গোলাপী শাড়ী, -
হয়ত আজিও চেয়ে আছে পথে কানন-কুমার তারি!
দিকে দিগেনে- যতদূর চাহি, পাংশু মেঘের জাল
পায়ে জড়াইয়া পথে দাঁড়ায়েছে আজিকার মহাকাল।
গাঁয়ের চাষীরা মিলিয়াছে আসি মোড়লের দলিজায়, -
গল্পের গানে কি জাগাইতে চাহে আজিকার দিনটায়!
কেউ বসে বসে বাখারী চাঁচিছে, কেউ পাকাইছে রসি,
কেউবা নতুন দোয়াড়ীর গায়ে চাঁকা বাঁধে কসি কসি।
কেউ তুলিতেছে বাঁশের লাঠিতে সুন্দর করে ফুল
কেউবা গড়িছে সারিন্দা এক কাঠ কেটে নির্ভুল।
মাঝখানে বসে গাঁয়ের বৃদ্ধ, করুণ ভাটীর সুরে,
আমীর সাধুর কাহিনী কহিছে সারাটি দলিজা জুড়ে।
লাঠির উপরে, ফুলের উপরে আঁকা হইতেছে ফুল,
কঠিন কাঠ সে সারিন্দা হয়ে বাজিতেছে নির্ভুল।
তারি সাথে সাথে গল্প চলেছে- আমীর সাধুর নাও,
বহুদেশ ঘুরে আজিকে আবার ফিরিয়াছে নিজ গাঁও।
ডাব্বা হুঁকাও চলিয়াছে ছুটি এর হতে ওর হাতে,
নানান রকম রসি বুনানও হইতেছে তার সাথে।
বাহিরে নাচিছে ঝর ঝর জল, গুরু গুরু মেঘ ডাকে,
এ সবের মাঝে রূপ-কথা যেন আর রূপকথা আঁকে!
যেন ও বৃদ্ধ, গাঁয়ের চাষীরা, আর ওই রূপ-কথা,
বাদলের সাথে মিশিয়া গড়িছে আরেক কল্প-লতা।
বউদের আজ কোনো কাজ নাই, বেড়ায় বাঁধিয়া রসি,
সমুদ্রকলি শিকা বুনাইয়া নীরবে দেখিছে বসি।
কেউবা রঙিন কাঁথায় মেলিয়া বুকের স্বপনখানি,
তারে ভাষা দেয় দীঘল সূতার মায়াবী নকসা টানি।
বৈদেশী কোন্ বন্ধুর লাগি মন তার কেঁদে ফেরে,
মিঠে-সুরি-গান কাঁপিয়ে রঙিন ঠোঁটের বাঁধন ছেঁড়ে।
আজিকে বাহিরে শুধু ক্রন্দন ছল ছল জলধারে,
বেণু-বনে বায়ু নাড়ে এলোকেশ, মন যেন চায় কারে।


রবিবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৭

ভূপেন্দ্র কুমার দত্ত


    ভূপেন্দ্র কুমার দত্ত


    শেয়ার করেছেন                                প্রণব কুমার কুণ্ডু।

স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং অগ্নিযুগের বিপ্লবী
ভূপেন্দ্র কুমার দত্ত (জন্মঃ- ৮ অক্টোবর, ১৮৯৪ - মৃত্যুঃ- ২৯ ডিসেম্বর, ১৯৭৯)

১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তিনি বিপ্লবী দলের অন্যতম নেতারূপে জার্মাণ অস্ত্রের সাহায্যে ভারতে অভ্যুত্থান ঘটানোর জন্য আত্মনিয়োগ করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ১৯১৭ সালে তিনি ধরা পড়ে যান। ঐ বছরের শেষে ভারত সচিব মন্টেগু সাহেব ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিচার বিবেচনা করার জন্য আগমন করলে রাজবন্দীরা একযোগে অনশন ধর্মঘট করেন। তখন ভূপেন্দ্র কুমার বিলাশপুরে প্রেরিত হয়েছিলেন। সেখানে আটাত্তর দিন নিঃসঙ্গ অবস্থায় অনশন করেন। তাকে দেশের মধ্যে রাখা বিপজ্জনক মনে করে কিছুদিনের মধ্যে তাকে বার্মার ইনসিন জেলে স্থানান্তরিত করা হয়। ১৯২০ সালে ছাড়া পাবার পরে দলের সিদ্ধান্ত অনুসারে গান্ধীজির অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেন। সংগঠনের ভিত্তি দৃঢ় ও প্রসারিত করার উদ্দেশ্যে বিপ্লবী কিরণ মুখার্জীর সঙ্গে দৌলতপুরে সত্যাশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। খুলনা সেনহাটের রবি রায় ও রসিক দাস এবং সেই সাথে চারু ঘোষ, কুন্তল চক্রবর্তী প্রমুখেরা সেই আশ্রমে যোগ দেন।
১৯২৩ সালে আবার তারা গ্রেফতার হন। ৫বছর পরে ১৯২৮ সালে মুক্তি পান। মুক্তি পাওয়ার পরে সবাই কলকাতা কংগ্রেসের বিরাট অনুষ্ঠানে যোগদান করেন। ১৯৩০ এর এপ্রিলে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের সাথে সাথে পুলিশ তৎপর হয়ে ওঠে এবং অন্যান্যদের সাথে ভূপেন্দ্র কুমার দত্তকে,  রাজশাহী কনফারেন্স থেকে ফেরার পথে গ্রেফতার করে। আবার দীর্ঘ আট বছর কারাবাসের পর ১৯৩৮ সালে মুক্তি পান। পুনরায় ১৯৪২ সালে ভারত ছাড় আন্দোলনের সময় ধরা পড়েন এবং ১৯৪৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত কারাবাস করেন।

পাকিস্তানে অতিবাহিত সময়
দেশ বিভাগের পরে পূর্ব পাকিস্তানে বাস করেন। দেশে এম.এল.এ ও পরে এম.পি হন। কিন্তু দেশে থাকা তার পক্ষে বেশীদিন আর সম্ভব হয়নি। কলকাতায় চলে যান।
ভারতে ফিরে আসা
কংগ্রেসের কাজে ও পড়াশুনা নিয়ে জীবনের শেষ কয়েকটি দিন কাটিয়ে দেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো যে, বৃটিশ সরকার তার বিরুদ্ধে কখনো কোন মামলা দায়ের করেনি। তবু তাকে জীবনের ২৫ বছর বিনা বিচারে জেল খানায় কাটাতে হয়। কারণ বৃটিশ সরকার তাকে ভয়ঙ্কর বিপদজনক মনে করে বাইরে রাখতে ভয় পেত। 
এক সময় তিনি সাপ্তাহিক স্বাধীনতা পত্রিকা সম্পাদনা করেন।
জন্ম
তিনি বাংলাদেশের যশোর জেলার ঠাকুরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা কৈলাশ চন্দ্র দত্ত পার্শ্ববর্তী ফরিদপুর জেলার ম্যানেজার ছিলেন। তার মাতা বিমলাসুন্দরী একজন দানশীল মহিলা ছিলেন। কমলিনী, যদুগোপাল, স্নেহলতা, সুপ্রভা নামে তার চার সহদোর ছিল।
একবার রামায়ণ পড়ার সময় সে লক্ষণের বীরত্বের কাহিনী জানতে পারে এবং ব্রহ্মচর্যে তার দখল সম্পর্কে পড়ে। এরপরে সে তার মার কাছ থেকে ব্রহ্মচর্য সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে,  নিজে সেই পথ অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত নেন। ফরিদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে থাকাকালীন সময়ে তিনি অনুশীলন সমিতিতে যোগ দেন এবং পরবর্তীতে  বিভিন্ন মানবিক কার্যক্রম এবং ১৯০৫ সালের দেশ বিভাগের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। 
উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য প্রথমে কলকাতায় স্কটিশ চার্চ কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু ১৯১৩ সালে দৌলতপুর হিন্দু একাডেমী কলেজ (পরবর্তীতে বি এল কলেজ)-এ চলে আসেন। এখানেই দেশ প্রেমিক অধ্যাপক শশীভূষণ রায় তাকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করেন। ভূপেন্দ্র কুমার শরীরচর্চা এবং নানা রকম সেবা মূলক কাজের মাধ্যমে নিজেকে অত্যান্ত জনপ্রিয় করে তোলেন। শীঘ্রই তিনি বিপ্লবী দল গঠনে তৎপর হন। ঐ সময় বাঘা যতীন যশোর-ঝিনাইদহ রেললাইন নির্মাণের ঠিকাদারী কর্মসূত্রে যশোরে থাকার সময় মাঝে মাঝে তার বন্ধু দৌলতপুর কলেজের অধ্যাপক শশীভূষণ রায় ও শৈলেন মৌলিকদের সাথে দেখা করতে আসতেন। সেই সময় তার সাথে ভূপেন্দ্রের পরিচয় হয়। ঐ আমলে বিপ্লবী দলভূক্ত সতীশ সেনগুপ্ত অধ্যাপক হিসাবে এবং যশোর বনগাঁ নিবাসী ডাঃ অমুল্য চরণ উকিল ডাক্তার হিসাবে এই কলেজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
ইতহিাসে তার অবদান
তার আত্মজীবনী মূলক লেখা -বিপ্লবের পদচিহ্ন।
Indian Revolution and the Constructive Programme 




শনিবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০১৭

আব্বাস্‌উদ্দীন



আব্বাস্উদ্দীন

শেয়ার করেছেন                 প্রণব কুমার কুণ্ডু।

পল্লীগীতি এবং লোকসঙ্গীত শিল্পী
আব্বাসউদ্দীন আহমদ (জন্মঃ- ২৭ অক্টোবর, ১৯০১ - মৃত্যুঃ- ৩০ ডিসেম্বর, ১৯৫৯)
(আমার শিল্পী জীবনের কথা- আব্বাসউদ্দীন আহমদ-সৃষ্টি প্রকাশনী অনুযায়ী)

তিনি প্রথমে ছিলেন পল্লীগায়ের একজন গায়ক। বিভিন্ন গ্রাম্য অনুষ্ঠানে গান শুনে তিনি গানের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন এবং নিজ চেষ্টায় গান গাওয়া রপ্ত করেন। এরপর কিছু সময়ের জন্য তিনি ওস্তাদ জমিরউদ্দীন খাঁর নিকট উচ্চাঙ্গ সংগীত শিখেছিলেন। রংপুর ও কুচবিহার অঞ্চলের ভাওয়াইয়া, ক্ষীরোল চটকা গেয়ে আব্বাস উদ্দীন প্রথমে সুনাম অর্জন করেন। তারপর জারি, সারি, ভাটিয়ালি , মুর্শিদি, বিচ্ছেদি, দেহতত্ত্ব, মর্সিয়া, পালা গান ইত্যাদি গান গেয়ে জনপ্রিয় হন। তিনি তার দরদভরা সুরেলা কণ্ঠে পল্লি গানের সুর যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন তা আজও অদ্বিতীয়। তিনি কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীন, গোলাম মোস্তফা প্রমুখের রচিত গানেও কণ্ঠ দিয়েছেন। আব্বাস উদ্দিন এইচ এম ভি থেকে গানের রেকর্ড বের করতেন। আব্বাসউদ্দীনের প্রথম রেকর্ডে ছিল ‘ওকি গাড়িয়াল ভাই’ ও ‘ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে’ গান দুটি। তার গাওয়া উল্লেখযোগ্য গানের মধ্যে রয়েছে- ও আমার দরদী আগে জানলে, ওকি ও বন্ধু কাজল ভ্রমরারে, মাঝি বাইয়া যাওরে, সোনাবন্ধুরে কোন দোষেতে যাইবা ছাড়িয়া, আমার হাড় কালা করলা মরে, আল্লাহ মেঘ দে পানি দে, নদীর কূল নাই কিনার নাইরে, আমায় এত রাতে কেনে ডাক দিলি, আমায় ভাসাইলিরে আমায় ডুবাইলিরে, থাকতে পারঘাটাতে তুমি পারের নাইয়া প্রভৃতি। এ ছাড়া কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত গান ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ তার কণ্ঠে প্রথম রেকর্ড করা হয়। আব্বাস উদ্দীন ১৯৩১ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত কলকাতায় বসবাস করেন। প্রথমে তিনি রাইটার্স বিল্ডিংয়ে ডিপিআই অফিসে অস্থায়ী পদে এবং পরে কৃষি দপ্তরে স্থায়ী পদে কেরানির চাকরি করেন। এ কে ফজলুল হকের মন্ত্রীত্বের সময় তিনি রেকর্ডিং এক্সপার্ট হিসেবে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করেন। দেশ বিভাগের পর (১৯৪৭ সালে) ঢাকায় এসে তিনি সরকারের প্রচার দপ্তরে এডিশনাল সং অর্গানাইজার হিসেবে চাকরি করেন। দেশের প্রতিনিধি হিসেবে ১৯৫৫ সালে ম্যানিলায় দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় সংগীত সম্মেলন, ১৯৫৬ সালে জার্মানিতে আন্তার্জাতিক লোকসংগীত সম্মেলন এবং ১৯৫৭ সালে রেঙ্গুনে প্রবাসী বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনে তিনি যোগদান করেন।
আব্বাস উদ্দিন সম্পর্কে ফরহাদ মজহার বলেনঃ আব্বাস উদ্দিন কেবল গায়ক ছিলেন না, এই প্রজন্মের গায়করা যদি ভাবেন আব্বাস উদ্দিন শুধু গান গেয়ে এদেশের মানুষের মন জয় করেছেন তাহলে তা মস্ত বড় ভুল হবে। আব্বাস তাঁর সময়কালের আকাঙ্খা ও সংগ্রামকে ধারণ করেছিলেন,সঙ্গে ছিলেন কাজী নজরুল এবং আরো অনেকে।” তাঁর সন্তান ফেরদৌসী রহমান এবং মুস্তাফা জামান আব্বাসীও গান গেয়ে খ্যাতি লাভ করেছেন।
জন্ম
বিশিষ্ট কণ্ঠশিল্পী আব্বাস উদ্দীন আহমদ পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার জেলার তুফানগঞ্জ মহকুমার বলরামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা জাফর আলী আহমদ ছিলেন তুফানগঞ্জ মহকুমা আদালতের উকিল। বলরামপুর স্কুলে আব্বাসউদ্দীনের শিক্ষা জীবন শুরু হয়। ১৯১৯ সালে তুফানগঞ্জ স্কুল থেকে তিনি প্রবেশিকা এবং ১৯২১ সালে কুচবিহার কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। এখান থেকে বিএ পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হয়ে তিনি সংগীত জগতে প্রবেশ করেন।
চলচ্চিত্রে অভিনয়
আব্বাসউদ্দিন আহমেদ মোট ৪টি বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন।এই ৪টি সিনেমা হলো 'বিষ্ণুমায়া' (১৯৩২),'মহানিশা' (১৯৩৬), 'একটি কথা' ও 'ঠিকাদার'(১৯৪০)। ঠিকাদার সিনেমাতে আব্বাস উদ্দিন একজন কুলির ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। ধারণা করা হয় যে তিনি এর চেয়ে বেশি সংখ্যক চলচ্চিত্রে অভিনয় করলেও তা উল্লেখ করেন নি। কারণ সেই চরিত্রগুলো তেমন উল্লেখযোগ্য ছিল না। এসব সিনেমাতে তিনি গানও করেছিলেন।
গ্রন্থ ও পুরস্কার
আমার শিল্পীজীবনের কথা (১৯৬০) আব্বাস উদ্দীনের রচিত একমাত্র গ্রন্থ। সংগীতে অবদানের জন্য তিনি মরণোত্তর প্রাইড অব পারফরমেন্স (১৯৬০), শিল্পকলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৭৯) এবং স্বাধীনতা দিবস পুরস্কারে (১৯৮১) ভূষিত হন।
মৃত্যু
১৯৫৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর পল্লীগানের এই মহান সম্রাট মৃত্যুবরণ করেন।
আব্বাসউদ্দীন
(একটি ছোটো স্মৃতিচারণা)
মোহাম্মদ মাহ্ফুজউল্লাহ্
শৈশবে গ্রামোফোন রেকর্ডে গান শুনেই তার নামের সাথে প্রথম পরিচয়। আব্বাসউদ্দীনের গান ছাড়া তখন কোনো ‘কলের গানের আসর’ জমতো না। গ্রামোফোনের রেকর্ডের গানকেই সে সময় বলা হতো ‘কলের গান’। গ্রামে কারো বাড়িতে ‘কলের গান’ শুরু হলে আমরা দৌড়ে গিয়ে ভিড় জমাতাম, সেই গানের আসরে আমাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যেত। কত রাত জেগে যে ‘কলের গান’ শুনেছি, সে কথা ভাবলে আজও বিস্ময় লাগে।
আমাদের শৈশব-কৈশোরে গ্রামোফোন রেকর্ডে কত নামকরা কণ্ঠশিল্পীর গানই না শুনেছি। কিন্তু আব্বাসউদ্দীনের গান বেশি শুনতে না পারলে আমাদের মন ভরতো না। তাই ‘কলের গানের আসরে’ গেলেই আমাদের ফরমাশ হতো আব্বাসউদ্দীনের গানের জন্যে। গানের ভালোমন্দ তখন কিছুই বুঝতাম না; গানের গায়কী, গলার কাজ, সুরের মাধুর্য, রচনার উৎকর্ষ ইত্যাদি কাকে বলে তাও ছিল অজানা। তবুও, সুকণ্ঠ গায়কের গান ভালো লাগতো, আব্বাসউদ্দীনের রেকর্ড বাজলে আমরা তন্ময় হয়ে শুনতাম।
আব্বাসউদ্দীন কৈশোরেই আমাদের মন হরণ করেছিলেন। পল্লীগীতির প্রতি আমার আকর্ষণ আশৈশব। ভাটিয়ালী, বাউল, মুর্শিদী, মারফতি প্রভৃতি সুকণ্ঠে গীত হলে আজও আমি তন্ময় হয়ে শুনি। আব্বাসউদ্দীনের গাওয়া ইসলামী গান, ভাটিয়ালী, বাউল, মুর্শিদী, মারফতি গান আমার শোনার আগ্রহকে সেই কৈশোরেই বাড়িয়ে দিয়েছিল। তার গান যখন শুনতাম, যেন মনে হতো গায়ককেই চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি।
আব্বাসউদ্দীনের ছবি দেখেছিলাম পত্র-পত্রিকার পৃষ্ঠায়, গ্রামোফোন রেকর্ডের বিজ্ঞাপনে। কিন্তু কৈশোরেই তাকে নিজের চোখে দেখার সাধ জেগেছিল। আর সৌভাগ্যক্রমে, আমার স্কুল জীবনেই আব্বাসউদ্দীনকে দেখেছিলাম এক বিশাল জনসভায়। সেই জনসভায় বক্তৃতা দিয়েছিলেন জননেতা হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দী, আর গান গেয়েছিলেন আব্বাসউদ্দীন আহমদ ও তার সঙ্গীরা। হাজার হাজার শ্রোতাকে তারা সেদিন মাতিয়ে দিয়েছিলেন গান গেয়ে। আব্বাসউদ্দীনের গানে আগে থেকেই মুগ্ধ ছিলাম, সেদিন তাকে দেখেও মুগ্ধ হলাম।
মঞ্চের উপর হারমোনিয়াম নিয়ে বসেছিলেন শিল্পী আব্বাসউদ্দীন, তার চারপাশে সহশিল্পীবৃন্দ। ফর্সা সুন্দর চেহারা ও বাবড়ি চুলওয়ালা আব্বাসউদ্দীনের পরনে ছিল সাদা ধবধবে পায়জামা-পাঞ্জাবী, গলায় চাদর। দূর থেকে মনে হচ্ছিল যেন একজন তন্ময় সাধক ও মরমী ধ্যানস্থ হয়ে বসে আছেন। গান শুরু করার আগে তিনি শুদ্ধ ভাষায় চমৎকার উচ্চারণে দু’একটি কথা বললেন তারপর আঙুল চালালেন হারমোনিয়ামের রিডে। সেদিন তিনি গান গাওয়ার আগে কী কথা বলেছিলেন, এতকাল পর তা আর মনে নেই। যদিও প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর আগেকার সেই গানের আসরের স্মৃতি আমার মনে জীবন্ত হয়ে আছে।
পরবর্তীকালে অনেক জলসায় আব্বাসউদ্দীনের গান শোনার, তার সান্নিধ্যে আসার সুযোগ হওয়ায় লক্ষ্য করেছি, তিনি গান শুরু করার আগে প্রায়ই কিছু কথা বলতেন এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গানের কথার মর্ম শ্রোতাদের বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করতেন। তার বাসভবনে ঘরোয়া আসরেও অন্তরঙ্গ পরিবেশে যখন শিল্পীকণ্ঠে গান শুনেছি, তখনও এর ব্যতিক্রম চোখে পড়েনি। সেই অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে আব্বাসউদ্দীনের ইন্তেকালের পর এক নিবন্ধে আমি লিখেছিলাম, ‘ঘরোয়া মজলিসে যারা তার গান শোনার সৌভাগ্য লাভ করেছেন, তারা অবশ্যই লক্ষ করেছেন যে, গীতি-কাব্যের উৎকর্ষ অপকর্ষ সম্পর্কে প্রায়ই তিনি আবেগমুখর হয়ে উঠতেন এবং যে-কোনো সঙ্গীত পরিবেশনের আগে সঙ্গীতের বাণীটি সম্পর্কে তিনি শ্রোতার মনে আকর্ষণ ও আবেগ সৃষ্টির প্রয়াস পেতেন। গান গাইতে গাইতে তিনি মাঝে মাঝে এমন আবেগ-উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠতেন যে, তা সমবেত শ্রোতাদের মনে সংক্রামকের মতো প্রভাব বিস্তার করতো।’
কৈশোরের স্মৃতি মনে সঞ্জীবিত ছিল বলেই আব্বাসউদ্দীনকে খুব কাছ থেকে দেখার সাধ মনে মনে পোষণ করেছিলাম। পঞ্চাশ সালের দিকে ঢাকা আসার পর অনেক খ্যাতনামা শিল্পী সাহিত্যিকের সাথেই পরিচয়ের সুযোগ হয়। কিন্তু আব্বাসউদ্দীনের সাথে সাক্ষাৎ পরিচয়ের কিংবা তার সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ তখনো হয়নি। ঢাকা কলেজে প্রথম বর্ষে অধ্যয়নকালেই শুনেছিলাম পুরানা পল্টনে আব্বাসউদ্দীনের একটি বাড়ি আছে। তাকে দেখার বাসনা নিয়েই একদিন খুঁজে খুঁজে ঐ বাড়িতে গিয়ে হাজির হলাম। কিন্তু গিয়ে শুনলাম, এই বাড়িতে আব্বাসউদ্দীন থাকেন না, সেখানে কেন্দ্রীয় প্রকাশনা-দফতর ও ‘মাহে-নও’ পত্রিকার অফিস।
আব্বাসউদ্দীনের এই বাড়িটির নাম ‘হীরামন মঞ্জিল’। জিপিও-র পেছনে ‘মুক্তাঙ্গনের’ পাশে একটু অভ্যন্তরে ‘হীরামন মঞ্জিল’ অবস্থিত। আব্বাসউদ্দীনের স্মৃতিধন্য এই বাড়িতে এখনও তার পরিবার-পরিজন বাস করেন। আমাদের অনেক স্মৃতিই এই বাড়ির সাথে জড়িয়ে আছে। প্রথম এই বাড়িটি দেখতে গিয়ে শুনেছিলাম, পুরানা পল্টনের এই বাড়ির সঙ্গে আব্বাসউদ্দীন তার কুচবিহারের পৈতৃক বাড়ি ‘হীরামন মঞ্জিল’ বদল করেছেন। শিল্পীর মা মরহুমা হীরামন নেসার নামেই বাড়ির নাম ‘হীরামন মঞ্জিল’ রাখা হয়েছিল। সেই স্মৃতি সঞ্জীবিত রাখার জন্যে তিনি এই বাড়িটিরও নাম রেখেছেন ‘হীরামন মঞ্জিল’।
‘হীরামন মঞ্জিলে’ গিয়ে সেদিন শিল্পী আব্বাসউদ্দীনকে পাইনি। কিন্তু পেলাম কয়েকজন খ্যাতনামা কবি-সাহিত্যিককে। মনে পড়ে, কবি তালিম হোসেন, কবি আশরাফ সিদ্দিকী, কবি আবদুল রশীদ খান প্রমুখের সাথে ‘হীরামন মঞ্জিলের’ ‘মাহে-নও’ অফিসেই আমার প্রথম পরিচয় ঘটে। ‘মাহে-নও’-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন তখন জনাব এম. এ. নান্না। তার আসল নাম আলী আহমদ হলেও তিনি এম. এ. নান্না নামেই পরিচিত ছিলেন। কুমিল্লার অধিবাসী জনাব এ নান্না চমৎকার ইংরেজি লিখতেন। ইংরেজিতে তার এতখানি দখল ছিল যে তিনি কোনো ড্রাফট না করেই টাইপরাইটারে অবলীলায় বড় বড় প্রবন্ধ তৈরি করে ফেলতেন। সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ে লেখা তার অনেক প্রবন্ধ ডন, পাকিস্তান টাইমস, পাকিস্তান অবজারভার ও অন্যান্য পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাও তিনি লিখতেন, তবে বাংলা ভাষার ওপর তার তেমন দখল ছিল না। তাছাড়া তিনি তার বাংলা রচনায় আরবি-ফারসি শব্দ খুব বেশি ব্যবহার করতেন, কিন্তু তা সর্বত্র সুপ্রযুক্ত হতো না বলে উপভোগ্য আনন্দের স্বাদ দিতো না। এম. এ. নান্না লোকান্তরিত হয়েছেন কয়েক বছর আগে, সে সময়ে তিনি সম্ভবত রাজশাহী বেতার কেন্দ্রে কর্মরত ছিলেন। তার মৃত্যু-সংবাদ পত্রিকায়ও প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু কোনো শিল্পী-সাহিত্যিকই এই অমায়িক সদাহাস্যমুখ ও সাহিত্যপ্রাণ ব্যক্তিটিকে স্মরণ করেন নি। এম. এ. নান্নাই ‘হীরামন মঞ্জিলে’ আমাকে কবি তালিম হোসেন ও অন্যান্য অনেক কবি-সাহিত্যিকের সঙ্গে প্রথম পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। কবি তালিম হোসেন ছিলেন তার সহকর্মী ‘মাহে-নও’-এর সহসম্পাদক। পরবর্তীকালে আমিও তাদের সহকর্মী হয়েছিলাম। ঐ ‘হীরামন মঞ্জিলেই’ অধ্যাপক মুহম্মদ মনসুরউদ্দীনের সঙ্গে আমি প্রথম পরিচিত হই। তিনি ছিলেন তখন ‘মাহে-নও’ পত্রিকার সম্পাদক। পরে তার জায়গায় কবি আবদুল কাদির ‘মাহে-নও’-এর সম্পাদক হয়ে আসেন এবং ‘মাহে-নও’ অফিসও পরবর্তীকালে ৬নং পুরানা পল্টনে স্থানান্তরিত হয়ে যায়।
‘হীরামন মঞ্জিলের’ পাশের ঠিক উল্টোদিকেই ছিল ব্রিটিশ ইনফরমেশন অফিস ও লাইব্রেরি। এই সমৃদ্ধ লাইব্রেরিটিও ছিল আমাদের অন্যতম আকর্ষণ। সময় পেলেই আমরা এই তথ্যকেন্দ্র ও লাইব্রেরিতে বই পড়ার জন্যে যেতাম। সেখানে গেলেই ‘হীরামন মঞ্জিলে’ ও ‘মাহে-নও’ অফিসেও যাওয়া হতো, দেখা-সাক্ষাৎ হতো কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে। তরুণ কবি ও কুমিল্লার অধিবাসী হিসেবে নান্না সাহেব আমাকে বেশ স্নেহের দৃষ্টিতে দেখতেন। সম্ভবত চুয়ান্ন কী পঞ্চান্ন সালের দিকে ‘মাহে-নও’ অফিস ৬নং পুরানা পল্টনে স্থানান্তরিত হয়। আর ব্রিটিশ ইনফরমেশন অফিসের লাইব্রেরিটিও পরবর্তীকালে এক অগ্নিকাণ্ডে ভস্মীভূত হয়ে যায়। এর পেছনে অবশ্য একটি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ঘটনা এবং জনতার রোষবহ্নি ছিল। ১৯৫৬ সালে মিসরের ওপর ব্রিটেনের হামলার প্রতিবাদে ঢাকায় এক বিরাট মিছিল হয় এবং মিছিলকারীরা এক পর্যায়ে ব্রিটিশ ইনফরমেশন অফিসের এই লাইব্ররিতে অগ্নিসংযোগ করে। সেই আগুনে কাঠের তৈরি এই বাঙলো বাড়িটি পুড়ে যায়।
‘মাহে-নও’ অফিস স্থানান্তরিত হয়ে গেলেও, ‘হীরামন মঞ্জিল’-এর আকর্ষণ আমাদের জন্যে এতটুকুও কমেনি। শিল্পী আব্বাসউদ্দীনই ছিলেন সেই আকর্ষণের উৎস। তিনি তখন পরিবার-পরিজন নিয়ে ‘হীরামন মঞ্জিলে’ স্থায়ীভাবে বাস করছেন। তার বাসভবনে প্রায়ই সাহিত্যসভা, সঙ্গীতের আসর বসেছে, তাতে অংশ নিয়েছেন খ্যাতনামা শিল্পী-সাহিত্যিক ও গায়করা। তরুণ লেখক শিল্পী-সঙ্গীতের অনুরাগী হিসেবে আমরাও মাঝে-মাঝে যোগ দিয়েছি সে-সব আসরে, কখনো আমন্ত্রিত হয়ে, কখনো বা বিনা আমন্ত্রণেই। আব্বাসউদ্দীন তখন সরকারি প্রচার-বিভাগে ‘সং-পাবলিসিটি’র অর্গানাইজার। তার সহকর্মী তারই হাতে-গড়া অনেক খ্যাতনামা গায়ক-শিল্পী, তারাও অনেকেই আসেন সে-সব সাহিত্যসভা ও সঙ্গীতের আসরে। কথায়, কবিতায়, গানে-গল্পে প্রতিটি আসরই জমজমাট হয়ে ওঠে।
আব্বাসউদ্দীন শুধু সুকণ্ঠ শিল্পীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন সুরসিক, সদা হাস্যালাপী। গানে যেমন, তেমনি কথায়ও তিনি মাতিয়ে তুলতেন। গান গাওয়া তখন তিনি অনেকটা ছেড়ে দিয়েছেন, তবুও তিনি ছিলেন আসরের মধ্যমণি। তাকে ঘিরে কবি-সাহিত্যিক-গায়কদের আসর বসতো। এসব আসরেই বেদারউদ্দিন আহমদ, মমতাজ আলী খান, সোহরাব হোসেন, আবদুল লতিফ, ওসমান খান, আবদুল আলীম, গোলাম মোস্তফা, শমশের আলী, শামসুদ্দোহা এবং আরো অনেক শিল্পীর গান খুব কাছ থেকে শোনার সুযোগ হয়। আর ফেরদৌসী বেগম ও মোস্তফা জামান আব্বাসীর গান কত যে শুনেছি, তার তো ইয়াত্তাই নেই। এরা দু’জনই তখন খুব ছোট, গুণীপিতার সযতেœ লালনে অশেষ সম্ভাবনা আর প্রতিশ্রুতি নিয়ে বড় হয়ে উঠছেন। তখনই তাদের গানে শ্রোতারা মুগ্ধ।
মনে পড়ে, সাহিত্যের আসর ও গানের জলসা বসতো ‘হীরামন মঞ্জিল’-এর পশ্চিম দিকের একটি প্রশস্ত কামরায়। কার্পেট বিছানো, সাদা চাদরে ঢাকা কামরায় আমরা বসতাম জমাট হয়ে, ক্রমে লোকে ঘর ভরে যেতো, তারপর এক সময় শুরু হতো সাহিত্যসভা, কী গানের আসর। সন্ধ্যা পেরিয়ে অনেক সময়ই বেশ রাত হয়ে যেতো, কিন্তু আসর সহজে ভাঙতো না। ফেরদৌসী যেদিন কাসিক্যাল, কী পল্লীগীতি, ভাটিয়ালী-ভাওয়াইয়া গাইতেন কিংবা ওদের দুই ভাইবোনের দ্বৈত-সঙ্গীত হতো, সেদিন আসর চলতো অনেক রাত অবধি। শিল্পী ও সমঝদার পিতা পুত্র-কন্যাকে নিজেই ফরমাশ দিতেন বিশেষ বিশেষ গান গাওয়ার জন্যে। ট্র্যাজিক ও করুণামিশ্রিত গানের প্রতি শিল্পী আব্বাসউদ্দীনের ছিল অনেকটা সহজাত টান। মনে পড়ে, তিনি ফেরদৌসী ও আব্বাসীকে প্রায়ই ফরমাশ করতেন ঐ ধরনের কিছু গান পরিবেশনের জন্য। প্রায় আসরেই তার ফরমাশে ওদের গাইতে হতো ‘ও গাড়িয়াল ভাই’, ‘ফান্দে পড়িয়া বগা’, ‘আবো নওদাড়ীটা মরিয়া’, ‘প্রেম জানেনা রসিক কালা চান্দ’, ‘এত রাত্রে কেন ডাক দিলে’ ইত্যাদি অনেক গান। আব্বাসউদ্দীন নিজে তখন গান গাওয়া একরূপ ছেড়ে দিলেও অনুরাগীদের অনুরোধে তাকেও মাঝে মাঝে গাইতে হতো। তিনি তখন প্রায়ই গাইতেন, ‘দিনার দিন দিন ফুরাইল শুকনাতে তরুণী’। তার কণ্ঠে এই গান শুনে আমাদের চোখও অশ্রুসজল হয়ে উঠতো।
আব্বাসউদ্দীনের আরও ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ হয় চুয়ান্ন-পঞ্চান্ন সালের দিকে। সে-সময়ে আমরা ‘পাকিস্তান মজলিস’ নামে একটি সাহিত্য-সংস্কৃতি সংস্থা গঠন করেছিলাম। কবি গোলাম মোস্তফা, আবুল কালাম শামসুদ্দীন, কবি মঈনুদ্দীন, মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ, ইব্রাহীম খাঁ, মুজিবুর রহমান খাঁ, ফররুখ আহমদ, তালিম হোসেন, সৈয়দ আলী আশরাফ আরও অনেক শিল্পী-সাহিত্যিকই ছিলেন এই সংস্থার সাথে জড়িত। শিল্পী আব্বাসউদ্দীনেরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল এই সংস্থার সাথে। তার বাসভবন ‘হীরামন মঞ্জিল’-এ পাকিস্তান মজলিসের বৈঠক একাধিক বারই অনুষ্ঠিত হয়েছে। সম্ভবত এই সাহিত্য-সংস্কৃতি সংস্থা গঠিতও হয় সেখানে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকেই। পাকিস্তান মজলিসের উদ্যোগে আয়োজিত এক সেমিনারে শিল্পী আব্বাসউদ্দীন সঙ্গীত বিষয়ে একটি প্রবন্ধও পাঠ করেন। আব্বাসউদ্দীনের বাসভবনে সে-সময়ে প্রায়ই সাহিত্য-সভা বসতো।
মনে পড়ে এমনি এক সাহিত্য-সভায় শিল্পীর জ্যেষ্ঠপুত্র জনাব মোস্তফা কামাল আমার লেখা ‘মেঘ-রৌদ্রের খেলা’ শীর্ষক একটি কবিতার ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। মোস্তফা কামাল মেধাবী ছাত্র, সুবক্তা এবং সুলেখক হিসেবে ছিলেন তখনই বিশেষ পরিচিত। তার মুখে সেদিন আমার কবিতাটির সূক্ষ্ম বিচার-বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা শুনে আমি মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম।
মোস্তফা কামাল এখন খ্যাতনামা ব্যারিস্টার। এককালে প্রচুর প্রবন্ধ লিখলেও, এখন আর লেখেন না বললেই চলে। অন্তত তার লেখা পত্রিকায় তেমন দেখা যায় না। তাদের বাসভবন ‘হীরামন মঞ্জিলে’ সাহিত্য সভা তো হতোই, নববর্ষ, পহেলা বৈশাখ ইত্যাদি পর্ব উপলক্ষেও আয়োজিত হতো সাহিত্যসভা, বসতো গানের আসর। আব্বাসউদ্দীন অসুস্থ হয়েছেন, তবু তিনি তাতে শরিক হয়েছেন। ‘হীরামন মঞ্জিলের’ প্রাঙ্গণে-ফুলবাগানের শোভায় বিমণ্ডিত পরিবেশে আয়োজিত অনেক বৈকালিক অনুষ্ঠান আজও আমাদের স্মৃতি হয়ে আছে। আব্বাসউদ্দীনের অসুস্থতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাহিত্য সঙ্গীতের আসরও ক্রমে ক্রমে কমতে থাকে। কিন্তু সেই সদাহাস্যমুখ, সুরসিক ও সঙ্গীত পিপাসু শিল্পীর মনে ও অবয়বে অসুস্থতার কোনো ছায়া ফেলতে পারেনি। যখনই কোনো শিল্পী-সাহিত্যিক, বন্ধু-বান্ধব তার কাছে গিয়েছেন, সবাইকে তিনি হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানিয়েছেন।
আব্বাসউদ্দীন যখন একেবারে বিছানা নিয়েছেন তখন তার কাছে অনেকবারই গিয়েছি। কবি আবদুল কাদির, কবি তালিম হোসেন, ইজাবউদ্দীন আহমদ, কবি আজিজুর রহমান এবং আরও অনেকের সঙ্গেই সে সময়ে তার সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। এদের সাথে ছিল তার দীর্ঘকালের পরিচয় ও সৌহার্দ্যরে সম্পর্ক। তার কাছে গেলে সেই অসুস্থতার সময়েও তিনি উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠতেন। মনে পড়ে অসুস্থ আব্বাসউদ্দীন তার আত্মজীবনীমূলক রচনা ‘আমার শিল্পী জীবনের কথা’র অংশবিশেষ আমাদের পড়ে শুনিয়েছিলেন। তার পরিচ্ছন্ন ও চমৎকার হাতের লেখা দেখে সেদিন মুগ্ধ হয়েছিলাম। আমরা বসে থাকতে থাকতেই তার এক অনুরাগী অসুস্থ শিল্পীর জন্যে কিছু ‘দাওয়াই’ নিয়ে এলেন। শিল্পীর মুখেই শুনলাম, তার ভক্ত অনুরক্তদের অনেকেই দূর-দূরান্তর থেকে ওষুধপত্র, লতাপাতা, তাগা-তাবিজ, পানিপড়া ইত্যাদি পাঠিয়ে থাকেন। অনেকে চিঠি লিখে শিল্পীর অসুস্থতায় তাদের মনোবেদনা প্রকাশ করেন, সেই চিঠিতে থাকে তার আশু রোগনিরাময়ের জন্যে আন্তরিক ও আকূল প্রার্থনার ভাষা। দু’একটি চিঠি পড়ে আমরাও অভিভূত হয়েছিলাম।
কিন্তু কারো ওষুধে আন্তরিক প্রার্থনায়ও কোনো ফল হলো না। আব্বাসউদ্দীনের স্বাস্থ্যের অবনতিই হতে লাগলো। লক্ষ করলাম তার একটি পা শুকিয়ে তখনই একরূপ কাঠ হয়ে গেছে, যদিও শিল্পীর মুখের সেই অনিন্দ্য হাসিটি একেবারে ম্লান হয়নি। কিন্তু ক্রমে তার জীবনশক্তি কমে এল, তিনিও অসুস্থতার কাছে আত্মসমর্পণ করতে লাগলেন। তারপর একদিন বিদায় নিলেন এই রৌদ্র-ছায়াময় পৃথিবী থেকে। ‘খাঁচার ভেতর যে অচিন পাখি’ আসা-যাওয়া করত সে চলে গেল কোন মহাশূন্যে এক অচেনা জগতে। কিন্তু গানের পাখি উড়ে গেলেও, তার স্মৃতি পড়ে রইল, পড়ে রইল সেই সুর সেই কণ্ঠ।
আজও যখন গ্রামোফোন রেকর্ডে, বেতারে তার গাওয়া গান শুনি, মুহূর্তেই তন্ময় হয়ে যাই, কৈশোরের-যৌবনের অনেক স্মৃতির ছবিই মনে ভেসে ওঠে, চেতনায় গুঞ্জরিত হয় সেই মরমী কণ্ঠস্বর, ‘দিনার দিন দিন ফুরাইল শুকনাতে তরণী/বইসারে দিন গুনি।’


তিতুমীর


তিতুমীর

শেয়ার করেছেন                                প্রণব কুমার কুণ্ডু ।




এই বাংলার মাটিতে তিতুমীর কে আমাদের কে স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসাবে প্রতিপন্ন করেই পরীক্ষায় পাশ করতে বাধ্য করা হয়েছে ।
মাধ্যমিকের সিলেবাসে আমাদের সমাজের ছাত্র/ছাত্রীরা পড়ছে,  তিতুমীর ওয়াহাবী আন্দোলনের জনক।
১৬/১১/১৮৩৯ খ্রীষ্টাব্দে এই তিতুমীর বাদুড়িয়া থানার রামচন্দ্র পুর গ্রামের ব্রাক্ষ্মণ দের হিন্দু কন্যাদের ধরে ধরে মুসলমানদের সঙ্গে নিকা দিয়েছিল, তাদের পরিবারের লোকজনদেরর মুসলমান হতে বাধ্য করে সেই ব্রাক্ষ্মণ দের মুখে জোর করে গরুর মাংস দিয়ে ইসলামী শান্তি বিস্তার করে, তৎকালীন বসিরহাট থানার দারোগা রামরাম চক্রবর্তীকে ইসলাম গ্রহণের নির্দশ দেয়, তিনি তা ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করলে,  বাঁশের কেল্লার নিকটবর্তী বুরুজ গ্রামের ইছামতী নদীর তীরে নিয়ে জবাই করে। 
যদি ইতিহাস জিহাদী তিতুমীরকে স্বাধীনতা সংগ্রামীর তকমা দিতে পারে ----তবে নাথুরাম গডসের অপরাধ কি????

(তথ্য সংগ্রহ --- বাংলার মাটিতে ইসলামের উদয়। ডঃ রূদ্রপ্রতাপ চট্টোপাধ্যায়)